প্রাণীর চোখে পৃথিবী ও আমাদের ভবিষ্যৎ -মো. মামুন হাসান শহরের ব্যস্ত সড়ক। ছুটছে গাড়ি, ছুটছে মানুষ। ফুটপাতের এক পাশে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে একটি কুকুর। রোদের মধ্যে হাঁপাচ্ছে আরেকটি প্রাণী। একটু দূরে খাবারের সন্ধানে ঘুরছে কয়েকটি বিড়াল। প্রতিদিনের পরিচিত দৃশ্য। আমরা দেখি, কিন্তু কতটা দেখি তাদের পৃথিবী? প্রাণীরা মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে না। কিন্তু ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ভয়, ব্যথা, নিরাপত্তা ও স্বস্তির প্রয়োজন তাদেরও আছে। মানুষের সঙ্গে তাদের পার্থক্য আছে, কিন্তু অনুভূতির জগতে অনেক মিলও রয়েছে। সেই উপলব্ধিকে সামনে রেখে ৪ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব প্রাণী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য-‘See the World Through Their Eyes’, অর্থাৎ ‘তাদের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখুন’। বিশ্ব প্রাণী দিবসের ইতিহাসও পুরোনো। ১৯২৫ সালের ২৪ মার্চ জার্মানির বার্লিনে প্রথমবার এ দিবস পালিত হয়। জার্মান লেখক ও প্রাণী রক্ষাকর্মি হেইনরিখ জিমারম্যান ছিলেন এর অন্যতম উদ্যোক্তা। পরে ১৯৩১ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ৪ অক্টোবরকে বিশ্ব প্রাণী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি হয়। প্রকৃতিতে কোনো প্রাণীই অপ্রয়োজনীয় নয়। ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ থেকে হাতি-সবাই কোনো না কোনোভাবে খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত। একটি প্রজাতি হারিয়ে গেলে শুধু একটি প্রাণী কমে যায় না; এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো পরিবেশব্যবস্থায়। বাংলাদেশের বন ও বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র্যও কম নয়। বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১২১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৬৯০ প্রজাতির পাখি, ১৫৮ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৫৩ প্রজাতির উভচর রয়েছে। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে ৫টি ও সরীসৃপের মধ্যে ১৯টি সামুদ্রিক প্রজাতি। পাখির ৩৮০টি আবাসিক, ২০৯টি শীতকালীন পরিযায়ী, ১১টি গ্রীষ্মকালীন পরিযায়ী এবং ৮৮টি ভ্রাম্যমাণ। কিন্তু প্রজাতির সংখ্যা থাকলেই তাদের নিরাপদ বলা যায় না। আবাসস্থল ধ্বংস, বন উজাড়, দূষণ, অবৈধ শিকার ও বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, নদী-জলাভূমির পরিবর্তন এবং মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাত-সব মিলিয়ে অনেক প্রজাতির টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)-এর ২০১৫ সালের রেড লিস্ট অনুযায়ী, মূল্যায়ন করা ১ হাজার ৬১৯টি প্রাণী প্রজাতির মধ্যে ৩৯০টি বা ২৪ শতাংশ বিপন্ন। এর মধ্যে ৫৬টি মহাবিপন্ন, ১৮১টি বিপন্ন এবং ১৫৩টি ঝুঁকিপূর্ণ। ৩১টি প্রজাতি আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একসময় বাংলাদেশে পাওয়া একশৃঙ্গ গণ্ডার ও জাভা গণ্ডারের মতো প্রাণীও এখন দেশের প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেছে। তবে সংরক্ষণে আশার জায়গাও আছে। কক্সবাজারের ইনানী জাতীয় উদ্যানে সাম্প্রতিক গবেষণায় মহাবিপন্ন মেঘলা চিতা ও এশীয় হাতির উপস্থিতি সনাক্ত হওয়ার তথ্য এসেছে। এসব উপস্থিতি দেখায়, উপযুক্ত আবাসস্থল ও কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকলে বিপন্ন প্রাণীর টিকে থাকার সুযোগ রয়েছে। বন্যপ্রাণীর বর্তমান অবস্থা ও ঝুঁকি আরও নির্ভুলভাবে নিরূপণে রেড লিস্ট হালনাগাদের কাজ চলছে। ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি বন অধিদপ্তর ও আইইউসিএন বাংলাদেশ-এর মধ্যে এ বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ‘আপডেটিং ফনাল রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান রেড লিস্ট হালনাগাদ এবং সামুদ্রিক গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীসহ নতুন প্রজাতি অন্তর্ভুক্তির কাজ চলছে। প্রায় ২ হাজার ২০০ প্রজাতির সংরক্ষণ অবস্থা পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ শুধু তালিকা তৈরির কাজ নয়। কোন প্রজাতি কতটা ঝুঁকিতে, কোথায় তার আবাসস্থল, কী ধরনের হুমকি রয়েছে এবং কোন প্রজাতিকে আগে সংরক্ষণে গুরুত্ব দেয়া দরকার-এসব সিদ্ধান্তে হালনাগাদ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ২০২৬ সালে নতুন বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনও হয়েছে। এ আইনে বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ, কল্যাণ, আবাসস্থল ও করিডোর সুরক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতির তালিকা হালনাগাদের দায়িত্ব বন অধিদপ্তরের ওপর দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে প্রাণিকল্যাণের ক্ষেত্রেও রয়েছে প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯। এ আইনে অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণ, পর্যাপ্ত খাদ্য-পানি না দেয়া, অপ্রয়োজনীয় প্রহার, অনুপযুক্তভাবে আবদ্ধ রাখা এবং আরও কিছু আচরণকে নিষ্ঠুরতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। আইনের পাশাপাশি মাঠপর্যায়েও চলছে বিভিন্ন কর্মসূচি। হাতি সংরক্ষণে ২০২৫ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় হাতির করিডোর পুনরুদ্ধার, ১৫৯টি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সক্ষমতা বৃদ্ধি, গবেষণা ও জনসচেতনতার কাজ চলছে। বাঘ, শকুন ও ডলফিন সংরক্ষণেও পৃথক কার্যক্রম রয়েছে। ডলফিন, ঘড়িয়াল ও র্যাপ্টর সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ও কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সুন্দরবন এলাকায় ৪৯টি টাইগার রেসপন্স টিম ও ৭টি ডলফিন কনজারভেশন টিম কাজ করছে। শকুন সংরক্ষণেও রয়েছে বিশেষায়িত দল। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু প্রাণী রক্ষা নয়; তাদের আবাসস্থল, খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ধরে রাখা। প্রাণীকে কাছ থেকে দেখার অন্যতম স্থান চিড়িয়াখানা। কিন্তু আধুনিক চিড়িয়াখানার দায়িত্ব শুধু দর্শনার্থীদের বিনোদন দেয়া নয়; প্রাণীকল্যাণ, সংরক্ষণ, গবেষণা, শিক্ষা ও সচেতনতা তৈরিও এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার আগস্ট ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ১২৫ প্রজাতির ৩ হাজার ৫৪০টি প্রাণী, পাখি ও মাছ রয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ প্রজাতির ১ হাজার ৯২৩টি পাখি, ১৯ প্রজাতির ৪০০টি বৃহৎ তৃণভোজী, ১২ প্রজাতির ১৪০টি ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী, ৮ প্রজাতির ৬৯টি সরীসৃপ, ২৮ প্রজাতির ৯৭৪টি মাছ এবং ৯ প্রজাতির ৩৪টি মাংসাশী প্রাণী রয়েছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সিংহ, এশীয় হাতি, জলহস্তী, জিরাফ, গণ্ডার, ভাল্লুক, হায়েনা, বানর, কুমির, ঘড়িয়াল, অজগরসহ নানা প্রাণী সেখানে রয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১১টি বিশ্ববিদ্যালয় ও ৫টি কলেজের ১ হাজার ১৮ জন শিক্ষার্থী ইন্টার্নশিপ করেছে। একই সময়ে ৯৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১১ হাজার ৮৬১ জন শিক্ষার্থী শিক্ষা সফরে চিড়িয়াখানা পরিদর্শন করেছে। ফলে এটি বিনোদনের পাশাপাশি প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে শেখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। প্রাণীর কল্যাণের সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যও গভীরভাবে যুক্ত। মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশ- তিনটি আলাদা জগৎ নয়; তারা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। জলাতঙ্ক এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। একইভাবে প্রাণিসম্পদ খাতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করাও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ২০২৬ সালে ‘ভেটেরিনারি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ গাইডলাইন’ প্রকাশ করেছে। তাই প্রাণীর প্রতি দায়িত্ব শুধু বন বা চিড়িয়াখানার দায়িত্ব নয়। নগর পরিকল্পনায় পথপ্রাণীর নিরাপত্তা, সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণে বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ, জলাভূমি ও বন রক্ষা এবং খামারে প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণের সুযোগ-এসব বিষয়ও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। পথপ্রাণীকে অযথা আঘাত না করা, পোষা প্রাণীর যথাযথ যত্ন নেয়া, বন্য প্রাণী কেনাবেচা ও অবৈধভাবে আটকে রাখা থেকে বিরত থাকা, প্লাস্টিক ও বর্জ্য যেখানে-সেখানে না ফেলা এবং বন-জলাভূমির আবাসস্থল রক্ষায় সচেতন হওয়া-ছোট ছোট এসব আচরণই বড়ো পরিবর্তনের ভিত্তি হতে পারে। পৃথিবী শুধু মানুষের নয়। বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ টিকে থাকলে টিকে থাকবে বন, নদী, জলাভূমি ও জীবনের স্বাভাবিক ভারসাম্য। বিশ্ব প্রাণী দিবস তাই শুধু একটি দিবস পালনের উপলক্ষ্য নয়- এটি নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে দেখার সুযোগ। অন্তত একবার প্রাণীর চোখ দিয়ে পৃথিবীটাকে দেখার চেষ্টা করা যাক। তখন হয়তো আরও স্পষ্ট হবে-প্রকৃতিকে বাঁচানো মানে শুধু প্রাণীকে রক্ষা করা নয়, নিজেদের ভবিষ্যৎকেও নিরাপদ করা। -লেখক: সিনিয়র তথ্য অফিসার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় -পি. ফি. Post Views: 39 Post navigation প্রবীণদের মর্যাদা ও অধিকার: আধুনিক সমাজের দায়বদ্ধতা