আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
বহুজাতিক তথ্য প্রযুক্তি সংস্থা ওরাকলের ভারতের অনেক কর্মচারীর পহেলা সেপ্টেম্বর ঘুম ভেঙেছিল একটি ইমেইল নোটিফিকেশন পেয়ে। সকাল ছ’টায় আসা ওই ইমেইল পেয়েছিলেন প্রায় তিন হাজার কর্মচারী এবং ইমেইলটি ছিল তাদের ছাঁটাই করার নোটিশ।

সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ অনেকেই লিখেছিলেন যে যাদের কাছে এই ইমেইলটি আসেনি, তারাও আশঙ্কা করছিলেন যে পরের দিন, দুই তারিখ হয়তো তাদের কাছেও ওই ইমেইল আসতে পারে।

অনেকেই এটিকে ‘সিক্স এএম হরর’ বা সকাল ছ’টার বিভীষিকা বলে উল্লেখ করেছেন। যদিও দোসরা সেপ্টেম্বর নতুন করে কারও কাছে এমন কোনো ইমেইল আসেনি।

দ্য ইকোনমিক টাইমেসের রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, ওরাকল, যা একটি আন্তর্জাতিক বিজনেস টু বিজনেস সফটওয়ার ডেভেলপমেন্ট সংস্থা, তারা সম্প্রতি ভারতে তাদের কর্মি সংখ্যা পুনর্গঠন করছে।

এর আগেও ওই সংস্থাটি ভারতে বহু কর্মচারীকে ছাঁটাই করেছে যা মোট ১৩ হাজার কর্মি ছাঁটাই করার লক্ষ্যমাত্রার অংশ। এটি দেশে ওই সংস্থার মোট কর্মি সংখ্যার ১০ শতাংশ।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ই-কমার্স ও তথ্য প্রযুক্তি সংস্থা অ্যামাজনও ভারতে বহু কর্মিকে ছাঁটাই করেছে বলে জানা যাচ্ছে। দ্য হিন্দুর খবর অনুযায়ী, সংখ্যাটি ১৪ হাজারের কাছাকাছি। এটি আসলে ভারতে তাদের ৩০ হাজার কর্মি কমানোর পরিকল্পনার অংশ।

মার্কেট রিসার্চ সংস্থা ট্রেন্ড-এর কর্ণধার পারেখ জৈন সংবাদপত্রটিকে জানিয়েছেন, শুধু ওরাকল নয়, মাইক্রোসফটও ভারতে প্রায় ৫০০জন কর্মিকে পারফরম্যান্স ইম্প্রুভমেন্ট প্রোগ্রাম বা সহজ ভাষায়, কাজের ওপরে কঠোর নজরদারির আওতায় এনেছে।

মি. জৈনের মতে, মাইক্রোসফটেও আসন্ন ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।বিবিসি

বিদেশি সংস্থাগুলো ছাড়াও দেশীয় সংস্থা যেমন ওলা ইলেকট্রিক ও জোম্যাটোতেও দুই শতাধিক ছাঁটাইয়ের খবর জানিয়েছে ইকনমিক টাইমস।

অন্য সংস্থার চাকরিজীবীদের উপরেও চাপ বাড়ছে
ফলে, ভারতের দক্ষ কর্মচারীদের মধ্যে চাকরির বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা ও চাকরিরতদের মধ্যে কাজ হারানোর আশঙ্কা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এক্স-এ একজন ইউজার লেখেন, “ওরাকল সংস্থায় চাকরি পেতে সাধারণত পাঁচ থেকে সাত রাউন্ড পর্যন্ত ইন্টারভিউ দিতে হয়। এর মতো এক গ্লোবাল জায়ান্ট যদি এত ছাঁটাই করে তখন তা টিসিএস, উইপ্রোর মতো দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলির কর্মিদের উপরেও ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা এবং চাপ সৃষ্টি করে।”

এক্স-এ কয়েকজন ব্যবহারকারী ওরাকল থেকে তাদের কাছে আসা ছাঁটাইয়ের ইমেইলটি শেয়ার করেছেন। সেই মেইলে সংস্থাটি জানিয়েছে যে, “সংস্থার সাংগঠনিক ক্ষেত্রে বড় মাপের পরিবর্তনের জন্য পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে।”

অর্থাৎ, ছাঁটাইকৃত পদে যে নতুন নিয়োগও হবে না, সেই বিষয়টিও সংস্থাটি পরিষ্কার করে দিয়েছে পদগুলোই বিলুপ্ত করে।

কর্পোরেট বিশেষজ্ঞ ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর আনমোল গার্গ সামাজিক মাধ্যমে তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্র নিয়ে কৌতুকপূর্ণ মন্তব্য করার জন্য বেশ জনপ্রিয়।

সম্প্রতি পোস্ট করা একটি রিলে তিনি বলেন, “এমনটা কিন্তু নয় যে ওরাকল সংস্থাটি আর্থিক ক্ষতির মুখে। কিন্তু তারা এআই ডেটা সেন্টার কেনার জন্য কর্মি ছাঁটাই করে বাজেট তৈরি করছে।”

চাকরি ছাঁটাইয়ের জন্য দায়ী কি এআই?
সামাজিক মাধ্যমে এই ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে এআই ডেটা সেন্টার ও অটোমেশন, অর্থাৎ কোনো প্রকৌশল বিষয়ক কাজে যান্ত্রিক ও এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনা করার প্রবণতার দিকে নির্দেশ করছেন।

সামাজিক মাধ্যমে সাম্প্রতিককালে হওয়া ছাঁটাইয়ের কারণের জন্য অনেকেই এআইকে দায়ী করেছেন।

যদিও অ্যামাজন ও ওরাকলের মতো সংস্থাগুলো এআই ব্যবহার ও অটোমেশন প্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধির কথা একাধিকবার বলে থাকলেও এই কারণেই যে তারা ছাঁটাই করছে, সেই বিষয়টি কখনো স্পষ্টভাবে বলেনি।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবর অনুযায়ী, অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস সম্প্রতি ১০ হাজার কোটি ডলার পুঁজি সংগ্রহ করছেন। তার মূল লক্ষ্য হলো অনেকগুলো ম্যানুফ্যাকচারিং ফার্ম কিনে অটোমেশন ও এআই-এর সাহায্যে সেগুলোকে উন্নত করে তুলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।

সম্প্রতি মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সিইও বিল গেটস তার ব্যক্তিগত ব্লগ ‘গেটস নোটস’-এ লিখেছেন, “বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির গতি কমিয়ে আনার কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা যদি কারও কাছে থাকত, তবে আমি সম্ভবত তা সমর্থন করতাম।”

‘দ্য টার্বুলেন্ট এরা অফ এআই ইজ হিয়ার’ শীর্ষক ওই প্রবন্ধে তিনি বিপুল পরিমাণ চাকরি ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা করেছেন এবং মানুষের জন্য চাকরি ‘সংরক্ষণের’ কথা বলেছেন।

“আমার বিশ্বাস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা এমন কিছু কাজ নির্দিষ্ট করে রাখব যা কেবল মানুষেরাই করবে। আমি এই ক্ষেত্রটিকে ‘হিউম্যান রিজার্ভড’ বলে অভিহিত করতে শুরু করেছি; এটি এমন এক ধারণা, যা নিয়ে আমাদের ভবিষ্যতে ভাবতে হবে।”

এআই ব্যবহারে অর্থনীতি ও রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি কুপ্রভাব?
চলতি বছরেই জুন মাসে বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গেরি সৌকালাস ও অধ্যাপক ব্রেট ফল্ক ‘এআই লেঅফ ট্র্যাপ’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।

সেই গবেষণাপত্রে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে তা হলো, এটি এমন এক সম্ভাব্য ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের বেশিরভাগ কাজ করার মতো সক্ষমতা অর্জন করবে।

বিল গেটসের মতোই সেই গবেষণাপত্রেও এআই-এর গতি কমানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সঙ্গে কিছু সমস্যার কথাও উল্লেখ করেছেন ওই দুই অধ্যাপক।

খরচ কমানোর লক্ষ্যে সংস্থাগুলো হয়তো কর্মিদের ছাঁটাই করে তাদের জায়গায় এআই-কে নিয়ে আসবে; কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই কর্মিরাই আবার গ্রাহক হিসেবে বিভিন্ন ব্যবসায় অর্থ ব্যয় করে থাকেন।

গবেষণাপত্রটি বলেছে, “যদি প্রতিটি কোম্পানিই বিপুল সংখ্যক কর্মিকে ছাঁটাই করে, তবে শেষ পর্যন্ত এমন খুব কম মানুষই অবশিষ্ট থাকবে যাদের কাছে কোনো কিছু কেনার এবং অর্থনীতিকে সচল রাখার মতো পর্যাপ্ত অর্থ থাকবে।”

গেরি সৌকালাস বিবিসি গ্লোবালকে বলেন, “এই সব ‘ফাউন্ডেশনাল ল্যাব’ বা মূল প্রযুক্তির উদ্ভাবক প্রতিষ্ঠানগুলোতে একসময় কাজ করে আসা সিইওরা বর্তমানে ক্রমাগত বলে চলেছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সবার চাকরি কেড়ে নেবে।”

“আর আমরা মূলত যে বিষয়টি বুঝতে চেয়েছিলাম তা হলো—যদি সব কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যায় এবং মানুষের জায়গায় রোবট চলে আসে, তবে পণ্য কেনার জন্য শেষ পর্যন্ত কারা অবশিষ্ট থাকবে?”

তিনি আরও বলেন, আমার ধারণা, সম্পদের বণ্টনের ক্ষেত্রে এমন ব্যাপক বৈষম্য দেখা দেবে যা আগে কখনও দেখা যায়নি।

“এ নিয়ে আমরা ইতোমধ্যেই নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি, এবং আরও হবো বলেই আমার পূর্বাভাস। আমরা যদি কোনো পদক্ষেপ নাও নিই, তবুও এই প্রযুক্তির উন্নতি অব্যাহত থাকবে, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। আর তখন সম্পদের চরম বৈষম্যজনিত সমস্যা দেখা দেবে, যা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং আরও নানা ধরনের জটিল পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।”

সমাধানের কোনো উপায় আছে?
কিন্তু এই বিষয়ে কি নির্দিষ্ট কোনও নীতি তৈরি করা যায় না?

এই প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক সৌকালাস বলেন, “বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন, ধরুন সিদ্ধান্ত হলো কাজের গতি কমিয়ে আনার—তখন পরিস্থিতি বদলে যায়।”

“ধরা যাক, অ্যানথ্রোপিক এবং ওপেনএআই কাজের গতি কমিয়ে আনার বিষয়ে সম্মত হলো। এরপর মাইক্রোসফ্টও তাতে রাজি হলো এবং গুগলও একই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিল।”

তার মতে, সেই আলোচনার কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পরই, যদি না কোনো শাস্তির ব্যবস্থা থাকে, তখন সংস্থাগুলির নিজের কাজের উন্নতির পেছনে মূল তাড়না বা উচ্চাকাঙ্ক্ষার কী হবে? এক্ষেত্রে ‘শাস্তি ও পুরস্কারের’ একটি ব্যবস্থা থাকা জরুরি, এবং শাস্তির বিষয়টি বেশ কঠোর হতে হবে।

“কারণ, হ্যান্ডশেক করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার ঠিক পরেই আপনি ভাবতে শুরু করবেন যে, এআই প্রযুক্তি গ্রহণ করলে কী কী সুবিধা বা বাড়তি লাভ পাওয়া সম্ভব।”

“তখন আপনি জানেন যে অন্য কেউ হয়তো তা করবে না, ফলে এটি আপনার জন্য একটি বড় সুযোগ এবং শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি আপনার দায়িত্বও বটে।”

ফলে, এআই-এর মতো একটা সহজ বিকল্প হাতে থাকতেও সংস্থাগুলো যথেচ্ছ এআই ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আদৌ সংযম দেখাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক গেরি সৌকালাস।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *