আন্তর্জাতিক ডেস্ক :রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে জোরালো ও কার্যকর সমর্থন চাইলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে একথা বলেন তিনি।বিবিসি এছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা তার সরকারের অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “একে অপরের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায়”। ভাষণের শুরুতে সাধারণ পরিষদের নবনির্বাচিত সভাপতিকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের আন্দোলনে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এখন ফ্যাসিবাদমুক্ত এবং “চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে”। ভাষণে তিনি তার বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অতীতে জাতিসংঘের মঞ্চ থেকে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেয়ার ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণও করেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সমর্থনবাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ভাষণে রোহিঙ্গা ইস্যু তুলে ধরে বলেন, প্রায় ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসায় দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। তার ভাষায়, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে, তাই সমাধানও সেখানেই নিহিত। তিনি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য জোরালো ও কার্যকর সমর্থন চাওয়ার পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের আগ পর্যন্ত জীবন রক্ষাকারী সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে এটি বড় ধরনের মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে। বৈশ্বিক সংঘাত ও কূটনীতি নিয়ে বার্তাবিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতের কারণে চাপে থাকা অর্থনীতি ও এবং বিপুল সংখ্যক বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীদের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ভাষণে বলেন, “জ্বালানি নিরাপত্তা-সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে”। তিনি বলেন, যেকোনো সংঘাতের সমাধান হওয়া উচিত আলোচনা, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান ও সমতা। বিশ্বজুড়ে উন্নয়ন বাজেট সামরিক খাতে সরিয়ে নেয়ার প্রবণতাকে বিশ্বশান্তির জন্য অন্তরায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। একইসঙ্গে ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবির প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সমর্থনের কথাও জানান তিনি। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, পিসবিল্ডিং কমিশনের ভাইস-চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। এছাড়া শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণ নারী-শান্তি-নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রতি দেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিপ্রধানমন্ত্রী তার সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কৌশলকে ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন’ বা ৩-আর নীতি হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, দেশের তরুণ উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকদের জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ‘ফ্যামিলি’, ‘ফার্মার্স’, ‘স্পোর্টস’ ও ‘ই-হেলথ’ কার্ডের কথাও তিনি তুলে ধরেন এবং ভবিষ্যতে এসব কার্ড সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানান। শিক্ষা খাতের অগ্রাধিকার তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবার শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষাখাতে জিডিপির হার বাড়িয়ে পাঁচ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ইউনিফর্ম ও দুপুরের খাবার দেয়ার পাশাপাশি শিক্ষা সিলেবাসে প্রথমবারের মতো স্পোর্টসকে একটি বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষাজলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের ভূমিকা সামান্য হলেও দেশটিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বহন করতে হচ্ছে। এসময় তার সরকারের আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানো এবং বন্যা-খরা মোকাবেলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথা জানান তারেক রহমান। সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ বাড়াতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরুর কথাও উল্লেখ করেন তিনি এবং আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। প্রযুক্তি ও এলডিসি উত্তরণডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতের এআই-বিভাজনে রূপ না নেয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। ভাষণে তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের আহ্বান জানান। এছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া টেকসই করতে অর্থায়ন, বাজার প্রবেশাধিকার ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। ভাষণের শেষাংশে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায় যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে এবং প্রতিটি নাগরিক দলমত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমান অধিকার ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারবে। Post Views: 34 Post navigation জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ