-লিটন এরশাদ মহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সড়ক শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার পথ নয়; এটি মানুষের জীবিকা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই থামিয়ে দিতে পারে জীবনের স্বাভাবিক গতি, বিপর্যস্ত করতে পারে একটি পরিবারকে। সড়ক দুর্ঘটনা তাই কেবল চালকের ভুল বা অনিবার্য দুর্ভাগ্যের বিষয় নয়। অতিরিক্ত গতি, অদক্ষ চালনা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক নকশা কিংবা দুর্ঘটনার পর চিকিৎসায় বিলম্ব—বিভিন্ন কারণ সম্মিলিতভাবে তৈরি করে প্রাণঘাতী পরিস্থিতি। এসব ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, কার্যকর আইন এবং সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ। ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ নিরাপদ সড়ক গড়ে তোলার গুরুত্বকে নতুন করে তুলে ধরেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রতিপাদ্যকে বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত করতে হবে। এ জন্য চাই কার্যকর আইন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, নিয়মিত মনিটরিং এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জবাবদিহি। বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ যানবাহন, চালক, লাইসেন্স ও পরিবহন-সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি অবকাঠামো, যানবাহনের কারিগরি মান, গতিসীমা, পথচারীর নিরাপত্তা, জরুরি চিকিৎসা ও দুর্ঘটনার তথ্য ব্যবস্থাপনাকেও একই কাঠামোয় আনতে হবে। এ লক্ষ্যেই স্বতন্ত্র ও সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পাচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির বিভিন্ন হিসাব বিষয়টির ব্যাপকতা তুলে ধরে। সরকারের এসডিজি তথ্যভান্ডারে বাংলাদেশ পুলিশের হিসাবে ২০২৪ সালে ৫,২০৫ জন নিহতের তথ্য রয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা একই বছরে বিআরটিএর তথ্য উদ্ধৃত করে ৫,৮৪০ জন নিহতের কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন সংগঠনের সংবাদমাধ্যমভিত্তিক ও নিজস্ব পর্যবেক্ষণে ২০২৪ সালে অন্তত ৭,২৯৪ জন এবং ২০২৫ সালে অন্তত ৭,৩৫৯ জন নিহত হওয়ার হিসাব প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে ২০২১ সালের জন্য সরকারি হিসাবে ৫,০৮৪ জন নিহতের বিপরীতে মডেলভিত্তিক অনুমান প্রায় ৩১,৫৭৮ জন। এটি ২০২১ সালের হিসাব, বর্তমান মৃত্যুসংখ্যা নয়। বিভিন্ন উৎস ও পদ্ধতির কারণে এসব সংখ্যার সরাসরি তুলনা সম্ভব নয়। তবে তথ্যের এই ব্যবধান পুলিশ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, বিআরটিএ ও মৃত্যুনিবন্ধন ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় করে নির্ভরযোগ্য জাতীয় দুর্ঘটনা তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে। স্বতন্ত্র সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে। সংশ্লিষ্ট উপকমিটি খসড়া তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে খসড়াটি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও অংশীজনের পরামর্শের অপেক্ষায় থাকার কথা উঠে আসে। ১৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় পাঠানোর প্রস্তুতির তথ্য প্রকাশিত হয়। ১৫ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে ২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত আইন প্রণয়নের সরকারি অঙ্গীকারও সামনে আসে। হেলমেটের মান হালনাগাদ, গতিসীমা কার্যকর করা, দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা জোরদার, মহাসড়কে নিরাপদ অবকাঠামো, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পারাপার এবং দুর্ঘটনার তথ্য ব্যবস্থাপনার মতো উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বাস ও ট্রাকের পরিচালন-সময়সীমা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণ, মহাসড়কে অ্যাম্বুলেন্স এবং হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসা উন্নয়নের বিষয়গুলোও বিবেচ্য। খসড়া থেকে চূড়ান্ত আইন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ এগিয়ে নিতে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়, জনপরামর্শ এবং বাস্তবসম্মত সময়সীমা প্রকাশের মাধ্যমে অগ্রগতি দৃশ্যমান করা প্রয়োজন। নতুন আইনের ভিত্তি হতে পারে ‘সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ বা নিরাপদ ব্যবস্থা পদ্ধতি। এর মূল ধারণা হলো, মানুষ ভুল করতে পারে; কিন্তু সেই ভুল যেন অনিবার্যভাবে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের কারণ না হয়। নিরাপদ সড়ক, উপযুক্ত গতি, নিরাপদ যানবাহন, দায়িত্বশীল সড়ক ব্যবহার এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা—এই পাঁচটি ক্ষেত্রকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়াই এর লক্ষ্য। জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১–২০৩০ সালের বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনাও সড়কব্যবস্থার সব অংশীজনের দায়িত্বকে গুরুত্ব দেয়। নতুন সড়ক ও বড় সংস্কার প্রকল্পে নিরাপত্তা প্রভাব মূল্যায়ন, নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং বিপজ্জনক বাঁক, ত্রুটিপূর্ণ সাইন, অরক্ষিত বিভাজক ও ঝুঁকিপূর্ণ রেলক্রসিং দ্রুত সংশোধনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ও জনবসতিতে ফুটপাত, নিরাপদ পারাপার, পর্যাপ্ত আলো এবং স্থানভিত্তিক গতিসীমা নিশ্চিত করতে হবে। পথচারী, সাইকেলচালক, মোটরসাইকেল আরোহী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধি ব্যক্তির নিরাপত্তাও পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর গতিসীমা প্রয়োগ, স্বচ্ছ জরিমানা ব্যবস্থা, মানসম্মত হেলমেট, সিটবেল্ট, শিশুদের উপযোগী আসন এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো প্রতিরোধে কার্যকর বিধান প্রয়োজন। চালকের লাইসেন্স দেওয়ার আগে তাত্ত্বিক জ্ঞান, ব্যবহারিক দক্ষতা, দৃষ্টিশক্তি ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা যাচাই করতে হবে। পেশাদার চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের নিয়ম এবং পরিবহন মালিক-ব্যবস্থাপকদের দায়িত্ব নির্ধারণও জরুরি। যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা হতে হবে প্রকৃত কারিগরি যাচাইয়ের ভিত্তিতে। ব্রেক, টায়ার, আলো ও স্টিয়ারিং পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণের নথি এবং জাল সনদ প্রতিরোধের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন অপসারণের পাশাপাশি পরীক্ষাকেন্দ্রের অনিয়মের দায়ও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েকটি মুহূর্ত আহত ব্যক্তির জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। পরিচয় যাচাই, নিবন্ধন বা অর্থ জমার অযথা বিলম্ব ছাড়াই জরুরি চিকিৎসা, গুরুতর রোগীর প্রাথমিক স্থিতিশীলতা, অ্যাম্বুলেন্স যোগাযোগ, হাসপাতাল রেফারেল ও ট্রমা চিকিৎসার সক্ষমতা নিশ্চিত করা দরকার। চিকিৎসার ব্যয়, সরকারি প্রতিপূরণ এবং আহত ব্যক্তি ও পরিবারের পুনর্বাসনের দায়িত্বও আইনে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে, দুর্ঘটনার তদন্তের উদ্দেশ্য শুধু দায়ী ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া নয়; ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা ঠেকাতে ব্যবস্থাগত ত্রুটি শনাক্ত করাও। জাতীয় ডেটাবেসে দুর্ঘটনার তথ্য, তদন্তের ফল, গৃহীত ব্যবস্থা ও বার্ষিক অগ্রগতি প্রকাশ করা হলে নীতিনির্ধারণ আরও তথ্যভিত্তিক হবে। এ কাজে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ বা স্থায়ী সমন্বয় কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জাতীয় কর্মপরিকল্পনা, সংস্থাগুলোর দায়িত্ব, বাজেট, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি তদারকির পাশাপাশি নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশের সক্ষমতা থাকতে হবে। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) তিন দশকের বেশি সময় ধরে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, নীতিগত প্রচার এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় কাজ করছে। সংগঠনটির ১২০টির বেশি স্থানীয় শাখা রয়েছে। ২০২৫ সালে পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন, পথচারী সুরক্ষা, মানসম্মত হেলমেট, সিটবেল্ট, শিশুদের নিরাপত্তা এবং সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের পূর্ণ ব্যবহারের মতো বিষয় সামনে আসে। একই বছর দেশব্যাপী ১,২৩৫টি কর্মসূচির পরিকল্পনার কথা প্রকাশিত হয়; এর মধ্যে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, চালকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কাজে লাগানো যেতে পারে। জাতীয় ও জেলা পর্যায়ের সমন্বয় কাঠামোয় অভিজ্ঞ নাগরিক সংগঠনের পরামর্শমূলক অংশগ্রহণ, দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম কার্যকর হতে পারে। আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতেই থাকবে; নাগরিক অংশগ্রহণ সেই প্রয়োগকে আরও জনমুখি ও জবাবদিহিমূলক করতে সহায়তা করবে। জাতিসংঘের লক্ষ্য ২০২১–২০৩০ সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা অন্তত অর্ধেকে নামিয়ে আনা। বাংলাদেশও ২০৩০ সালের মধ্যে মৃত্যুহার অর্ধেকে নামানোর অঙ্গীকার করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে আইন পাসের পাশাপাশি প্রয়োজন বিধিমালা, বাজেট, জনবল, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও নির্দিষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা। কত মৃত্যু কমল, কত ঝুঁকিপূর্ণ স্থান নিরাপদ হলো, কত চালক প্রশিক্ষণ পেলেন এবং জরুরি চিকিৎসা কতটা দ্রুত পৌঁছাল—এসব সূচকে নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ করা প্রয়োজন। সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ একটি নিরাপদ ও মানবিক পরিবহনব্যবস্থা গড়ার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। আইনটি যেন কেবল অপরাধ ও শাস্তির কাঠামো না হয়ে নিরাপদ অবকাঠামো, দায়িত্বশীল চালনা, নির্ভরযোগ্য তথ্য, দ্রুত চিকিৎসা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সমন্বিত ভিত্তি হয় তা নিশ্চিত করা জরুরি। সড়কে প্রতিটি জীবন মূল্যবান। তাই নিরাপদ চলাচলকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে রেখে খসড়া থেকে আইন, আইন থেকে বিধিমালা এবং বিধিমালা থেকে মাঠপর্যায়ের কার্যকর পদক্ষেপ—প্রতিটি ধাপে দায়িত্ব, সময়সীমা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একটি কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইনই নিরাপদ চলাচলকে নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করতে পারে। -পি. ফি. Post Views: 31 Post navigation ফ্যামিলি কার্ড: সামাজিক নিরাপত্তার নতুন ঠিকানা-খোন্দকার মাহ্ফুজুল হক