নেত্রকোণা প্রতিনিধি :

নেত্রকোণার সাংবাদিকতা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠনে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সংগঠক মাহবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম। পেশাগত জীবনে সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের পাশাপাশি সাংবাদিকদের কল্যাণ, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, সাহিত্যচর্চা এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে তার অবদান রয়েছে। দীর্ঘ চার দশকের সাংবাদিকতা জীবনে তিনি স্থানীয় মানুষের সমস্যা ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় জাতীয় গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

ভাষাসৈনিকের সন্তান হেলিম

মাহবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম ১৯৬৬ সালের ১ জানুয়ারি নেত্রকোণা শহরের মসজিদ কোয়ার্টার (মুক্তারপাড়া) এলাকার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম সামছুল কিবরিয়া চৌধুরী ছিলেন একজন ভাষাসৈনিক। মাতা মরহুমা হালিমুন্নেছা চৌধুরী। পরিবার ও সামাজিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা হেলিম শৈশব থেকেই নেত্রকোণার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে পরিচিত হন।

বর্তমানে তিনি নেত্রকোণা শহরের মসজিদ কোয়ার্টার (মুক্তারপাড়া) এলাকার ‘চৌধুরী কুটিরে’ বসবাস করছেন। তার স্থায়ী ঠিকানা নেত্রকোণা সদর উপজেলার লক্ষীগঞ্জ ইউনিয়নের সানকিউরা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘মিয়াবাড়ি’।

শিক্ষাজীবন ও নেতৃত্বের বিকাশ

হেলিমের শিক্ষাজীবন শুরু হয় নেত্রকোণার সামাজিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে। তিনি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগ এবং উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত নেত্রকোণা সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক (পাস) ডিগ্রি অর্জন করেন এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন।

ছাত্রজীবনেই তার মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) নেত্রকোণা সরকারি কলেজ ইউনিটে ক্যাডেট সার্জেন্ট হিসেবে তিনি মৌলিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে তিনটি জাতীয় প্যারেডে অংশ নেন। এসব অভিজ্ঞতা তার নেতৃত্বের গুণাবলি, দায়িত্ববোধ ও সাংগঠনিক দক্ষতা বিকাশে ভূমিকা রাখে।

চার দশকের সাংবাদিকতা জীবন

১৯৮৬ সালে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন মাহবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম। পেশাগত দক্ষতা ও জ্ঞান বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশে (পিআইবি) সাংবাদিকতার বিভিন্ন বিষয়ে ২১টি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়া ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের অধীনে সমাজকল্যাণবিষয়ক আটটি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

সাংবাদিকতা জীবনের শুরুতে তিনি দৈনিক ইনকিলাবের নেত্রকোণা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। পাশাপাশি ১৯৯০ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত দ্য ডেইলি স্টারের জেলা প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেন।

২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ২০১১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দৈনিক যুগান্তরে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক আমার দেশ ও বাংলাভিশনের নেত্রকোণা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দীর্ঘ এই পেশাগত পথচলায় নেত্রকোণার জনজীবন, সামাজিক সমস্যা, মানুষের অধিকার, বৈষম্য এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। স্থানীয় ঘটনাপ্রবাহকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার পাশাপাশি সাংবাদিকতার পেশাগত মানোন্নয়নেও ভূমিকা রেখে চলেছেন।

লেখালেখি ও সাহিত্যচর্চা

সাংবাদিকতার পাশাপাশি লেখালেখি ও সাহিত্যচর্চায়ও রয়েছে হেলিমের আগ্রহ। তার লেখা গ্রন্থ ও সমকালীন প্রবন্ধের সংখ্যা ২১১টি বলে জীবনীসংক্রান্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন তিনি।

সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয়ে নেত্রকোণার সৃজনশীল অঙ্গনে তার পরিচিতি গড়ে উঠেছে। ২০২৪ সাল থেকে তিনি নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সাহিত্য সংগঠনের নেতৃত্বের মাধ্যমে স্থানীয় সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তিনি সম্পৃক্ত রয়েছেন।

সাংবাদিকদের অধিকার ও কল্যাণে সাংগঠনিক ভূমিকা

মাহবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী হেলিমের কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তার সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড। ১৯৮৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, নেত্রকোণার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ সাল থেকে সাংবাদিক কল্যাণ সংস্থার সভাপতি হিসেবে কাজ করে আসছেন।

নেত্রকোণা জেলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বিভিন্ন মেয়াদে কখনো নির্বাচিত, কখনো মনোনীত সাধারণ সম্পাদক ও সদস্য সচিব হিসেবে পাঁচবার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০২৫ সাল থেকে তিনি নেত্রকোণা জেলা প্রেসক্লাবের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থ রক্ষা, পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তার দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তার সম্পৃক্ততা তাকে জেলার সাংবাদিক মহলে পরিচিত সংগঠক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ পথচলা

মানবাধিকার রক্ষায়ও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন হেলিম। ১৯৯৯ সালের আগস্ট থেকে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার নেত্রকোণা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

এই দায়িত্বের মধ্য দিয়ে মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অধিকারবঞ্চিত মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করে আসছেন। সাংবাদিকতার মাধ্যমে জনসমস্যা তুলে ধরার পাশাপাশি মানবাধিকারবিষয়ক সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে।

সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সম্পৃক্ততা

সাংবাদিকতা ও মানবাধিকার কর্মকাণ্ডের বাইরে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন মাহবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য। এ ছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, নেত্রকোণা রোগী কল্যাণ সমিতি এবং অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতির আজীবন সদস্য হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। ২০২৫ সাল থেকে তিনি নেত্রকোণা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের যুগ্ম মুতাওয়াল্লি এবং নেত্রকোণা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ কমিটির সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বহুমাত্রিক কর্মজীবন ও জনসম্পৃক্ততা

মাহবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী হেলিমের কর্মজীবন সাংবাদিকতা, সাহিত্য, মানবাধিকার ও সমাজসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত। জাতীয় গণমাধ্যমে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক নেতৃত্ব, সামাজিক উন্নয়ন এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন তিনি।

ভাষাসৈনিক পিতার উত্তরাধিকার, সাংবাদিকতা পেশায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং সমাজকল্যাণের প্রতি দায়বদ্ধতা তার কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

নেত্রকোণার সাংবাদিকতা ও সমাজে পরিচিত এক মুখ

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, পেশাগত দায়িত্বশীলতা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে মাহবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম নেত্রকোণার সাংবাদিকতা ও সামাজিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। সংবাদমাধ্যমে কাজ করার পাশাপাশি সাংবাদিকদের কল্যাণ, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, সাহিত্যচর্চা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততা তাকে বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত করেছে।

সাংবাদিকতা, সংগঠন ও সমাজসেবার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা তার দীর্ঘ কর্মজীবন নেত্রকোণার স্থানীয় ইতিহাস ও সামাজিক অগ্রযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত। একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে তার অভিজ্ঞতা এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড জেলার সাংবাদিকতা ও সামাজিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *