রাহুলের শেষ ছবি দেখার জন্য এখনও তৈরি নই আমি, এখনও মেনে নিতে পারিনি চলে যাওয়া। এই মৃত্যুর খবর যখন রাহুলের মা আর ছেলেকে দিতে হয়েছিল, সেই থেকেই স্তব্ধ হয়ে আছি: প্রিয়াঙ্কা

বিনোদন ডেস্ক :

রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর কেটে গেছে প্রায় আড়াই মাস। ছেলে সহজকে সঙ্গে নিয়ে এখন কাটছে প্রিয়াঙ্কা সরকারের দিনকাল। কাজের মধ্যেই নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছেন অভিনেত্রী। মুক্তি পেয়েছে তার নতুন ওয়েব সিরিজ় ‘তারকাটা’। ছবির প্রচারে সাদা শাড়িতে হাজির তিনি। হাতে এক কাপ কফি নিয়েই শুরু হল আড্ডা। কাজ, পরিবার, জীবন — সব নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর প্রতিনিধির মুখোমুখি হয়ে মন খুললেন প্রিয়াঙ্কা। আনন্দবাজার

প্রশ্ন: সহজকে নিয়ে গরমের ছুটিতে যাওয়ার কথা ছিল, গিয়েছিলেন?

প্রিয়াঙ্কা সরকার: না, যাওয়া হয়নি। আমার একটু কাজের চাপ ছিল। এই মুহূর্তে বেশি দিনের জন্য কলকাতা শহর ছাড়াও কঠিন ছিল আমার পক্ষে। তাই এই প্রতিশ্রুতির সেই ট্রিপটা বাকি রয়েছে। সহজ খুবই বুঝদার, এই পরিস্থিতি যে ভাবে ও সামলাল। সহজ খুবই সাহায্য করেছে আমায়।

প্রশ্ন: আপনি এবং সহজ এখন কেমন আছেন?

প্রিয়াঙ্কা: আমি ঠিক আছি। কাজের মধ্যেই রেখেছি নিজেকে। দারুণ কিছু মানুষ আমাকে ঘিরে রয়েছে। আর সহজও নিজের মতো করে গরমের ছুটি কাটাচ্ছে। ও গান নিয়ে ব্যস্ত, কম্পিউটার, গেমস — সব নিয়ে সময় কাটাচ্ছে। বন্ধুরাও রয়েছে ওর সঙ্গে। আমি যতটা পারছি ওকে সময় দিচ্ছি। বাড়ির সবাই সময় করে দেখা করছে ওর সঙ্গে। রাহুলের মায়ের কথাও আমি বলব না যে খুব ভাল আছেন, সেটা বলার অধিকারও নেই। আমরা নিজেদের মতো করে চেষ্টা করছি কঠিন সত্যটা মেনে নেয়ার। সময়ের সঙ্গে সবটা সহজ হয় না। আসলে নিজেকে বোঝাতে হয়, সেটাই করছি।

প্রশ্ন: রাহুলের পরিবারকেও আপনি সামলাচ্ছেন?

প্রিয়াঙ্কা: হ্যাঁ, যতটা সম্ভব পারছি সময় কাটাচ্ছি। সহজও থাকছে। দাদা ছিলেন বেশ কয়েক দিন। মা তার সঙ্গেও বিদেশে থাকবেন। দাদার সঙ্গে তার দুই ছেলেমেয়ের সঙ্গেও সময় কাটাবেন। এখন আমরা বেশির ভাগ লোকজনই ওকে ব্যস্ত রাখছি। কিছু কিছু সময় আসবে যখন কলকাতা শহরটা সহ্য করার মতো থাকবে না, সেই সময়ে বাইরে থাকলে ভাল থাকবেন। আবার আমি চাইব, সহজ তার বিশেষ দিনেও ঠাম্মিকে যেন পাশে পায়। আমি চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন: সকলকে সামলে নিজের কাছে ফেরার পর কি প্রিয়াঙ্কা ভেঙে পড়েন এখন?

প্রিয়াঙ্কা: আসলে আমি অনেকটা সময় চুপ থেকেছি ঠিকই। কিন্তু আমিও ভেঙে পড়েছি। যখন রাহুলের এ খবরটা তার মাকে দিতে হয়েছিল, আর তার কিছুক্ষণ পরই ছেলেকে দিতে হয়েছে, তার পর মনে হবে… না, মানে ঠিক বলে বোঝাতে পারব না। আসলে এর কোনও ক্লোজ়ার হয় না। আসলে আমাকে শক্ত থাকতেই হয়েছে। এটা আমার বড় হয়ে ওঠার মধ্যে পজ়িটিভ থাকার ট্রেনিং রয়েছে। আর তার মূল অংশ ছিল রাহুল অরুণোদয়দা বা বাবিন, নানা সময়ে নানা নামে ডেকেছি। ও সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিল। ও প্রফেশনালিজ়ম শিখিয়েছে। নিজের বাইরে বেরিয়ে অন্যদের কথা ভাবতে শিখিয়েছে। সেটা আমি করে যাব। আমি খুব প্রাইভেট মানুষ, খুব কাছের মানুষ ছাড়া আমি ভাঙতেও পারি না।

প্রশ্ন: ছবির চরিত্র বাছার ক্ষেত্রেও তো রাহুল আপনাকে সাহায্য করতেন?

প্রিয়াঙ্কা: সব ক্ষেত্রেই সাহায্য করেছে আসলে। এখনও ওর দেয়া কয়েকটা সিরিজ় আর ছবি লেখা আছে ফোনে যেগুলো দেখার কথা ছিল। এখনও দেখতে পারিনি আমি। আসলে ঘটনার আকস্মিকতাটা এতটাই যে এখনও মেনে নিতে পারিনি। ধীরে ধীরে মেনে নিতে হবে।

প্রশ্ন: রাহুল অরুণোদয় আপনার পারফরম্যান্স দেখতে পেলেন না, আক্ষেপ রয়ে গেছে ?

প্রিয়াঙ্কা: হ্যাঁ, সেটা তো থাকবেই। যাদের মতামত আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ তার মধ্যে রাহুল অন্যতম। ও আমার কাজের সবচেয়ে বড় সমালোচক ছিল। ও প্রশংসা করলে মনটা ভাল হয়ে যেত। সবচেয়ে এটাই মিস্ করি। অনেক কথা বলা হল না। আর একটা আক্ষেপ রয়ে যাবে আজীবন। সহজের গরমের ছুটিতে বান্ধবগড়ে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করছিলাম। সেখানে ওকে শেষ মেসেজে লিখেছিলাম, ‘ঠিক আছে এখনও অনেক সময় রয়েছে, রিসার্চ করে নেয়া যাবে’। এটা মেনে নিতে পারছি না। আসলে আমরা ভাবি অনেকটা সময়, আসলে সময় নেই। সময় থাকতে থাকতে সবটা করে নেয়া উচিত।

প্রশ্ন: রাহুল অরুণোদয়ের শেষ ছবি ‘ছবিওয়ালা’ আপনি দেখেছেন?

প্রিয়াঙ্কা: আমি দেখব নিশ্চয়ই, তবে এখনও তৈরি নই, একটু সময় লাগবে দেখতে। এটা ছাড়াও আরও কিছু কাজ রয়েছে যেগুলো আটকে রয়েছে। এটাই চাই, ওর অসমাপ্ত কাজগুলো দর্শকের সামনে আসুক। রাহুল দারুণ অভিনেতা ছিলেন, ওর প্রতি সেই শ্রদ্ধাটা যেন বজায় থাকে।

প্রশ্ন: রাহুল অরুণোদয়ের মৃত্যুর তদন্ত কোন পথে?

প্রিয়াঙ্কা: এই মুহূর্তে আপডেট দেয়ার মত খবর আমার কাছে কিছু নেই। যেগুলো রয়েছে সে বিষয়েও কিছু বলতে পারব না। কারণ এর একটা আইনি দিক রয়েছে। কিন্তু আমরা আশাবাদী। এই আশা করা ছাড়া আমাদের কাছে কোনও অপশন নেই। শুরুর দিন থেকে আমি প্রত্যেককে পাশে পেয়েছি। এটা শুধু আমাদের পরিবারের দাবি নয়। ইন্ডাস্ট্রির সকলেই উত্তর চান যে কী ভাবে এই ঘটনা ঘটল।

প্রশ্ন: ‘তারকাটা’ ছবির চরিত্র কতটা উপভোগ করেছেন?

প্রিয়াঙ্কা: যে সময়ে এটার শেষ মুহূর্তের কাজে ফিরেছি আমার বন্ধুরা না থাকলে সম্ভব হত না। ‘তারকাটা’ একটা মজার কাজ। ডার্ক হিউমার রয়েছে, যা আমি খুবই ভালবাসি। এত রিয়েল অ্যাকশন আগে দেখা যায়নি কোনও বাংলা ওটিটিতে। সব মিলিয়ে খুবই অন্যরকম একটা কাজ দর্শক আনন্দ পাবেন।

প্রশ্ন: আপনি নাকি বলেছিলেন ‘তারকাটা’ নামের একটি ছবি হলে আমি নেই, হতেই পারে না?

প্রিয়াঙ্কা: হ্যাঁ, আমি বলেছিলাম। বলেছিলাম এই প্রজেক্টে থাকা আমার ভাগ্যে লেখা আছে। কে সতেরো বছর বয়সে বাড়ি থেকে চলে আসে একটা সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়ে? কারণ, আমার কাছে আমি খুব স্বচ্ছ। আমি যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি সেটা ঠিক মনে হতে পারে, ভুলও মনে হতে পারে। আমি তারকাটা থাকতে চাই। পৃথিবী যা বলে বলুক না কেন, আমি আমার সিদ্ধান্তকেই গুরুত্ব দিই। কারণ, আমাকে বিভিন্ন সময়ে নানা মানুষ তারকাটা বলেছেন। আর আমি তা প্রশংসা হিসেবেই নিয়েছি। এবং সহজও তারকাটা হোক, সেটা আমি চাই। ও সাহস রাখুক, যেটা করতে চায় করুক এবং নিজের কাছে সৎ থাকুক।

প্রশ্ন: নিজে সিদ্ধান্ত নিলে আক্ষেপ কম হয়?

প্রিয়াঙ্কা: হ্যাঁ অবশ্যই। আমার জীবনের যে কোনও সিদ্ধান্তের দায় আমার। ভুল সিদ্ধান্তেরও দায় আমার। কাউকে দোষ দেওয়ার নেই। কোনও আক্ষেপ নেই। যা যা হয়েছে জীবনে ভাল হয়েছে। কখনও কখনও জীনের সেরা সময় এসেছে, কখনও আবার শিক্ষা পেয়েছি। জীবনের প্রতি এই পন্থা থাকা জরুরি।

প্রশ্ন: প্রযোজক এবং অভিনেতা বিক্রমের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?

প্রিয়াঙ্কা: আমি বহু বছর ধরে বিক্রমকে চিনি, ওর কাজ দেখি। যে ভাবে ওর সফর এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তা দারুণ। প্রযোজক হিসেবে নতুন একটা কাজ করার ঝুঁকি নিয়েছে, সেটা খুবই প্রশংসার দাবি রাখে। যে ভাবে অভিনেতা হিসেবে ও কাজ বাছাই করে সেটাও শেখার। এমনিও বিক্রম খুব পরিশ্রমী এবং যত্ন নিয়ে কাজ করে। সহ-অভিনেতা হিসেবে এমন দেখলে সত্যিই নিজের কাজ আরও উন্নত হয়।

প্রশ্ন: টলিউডেও পরিবর্তন এসেছে, কী ভাবে দেখছেন?

প্রিয়াঙ্কা: অনেক কিছুই দর্শকের সামনে রয়েছে। যদি ইন্ডাস্ট্রিকে একটা পরিবার বলি, তা হলে এটা ভেবে দেখা ভাল, কোন পরিবারই বা নির্ঝঞ্ঝাট থাকে? সমস্যা তো আসতেই পারে। এক লক্ষ মানুষ একসঙ্গে কাজ করা মানে সমস্যা লেগেই থাকবে। সেগুলো অনেক বেশি দর্শকের সামনে চলে এসেছে। এটা কোথাও গিয়ে শিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধা কমায়। আমি শুধু এটুকুই বলব যে, শুরুর দিন থেকে সকলকে যে ভাবে পাশে পেয়েছি তার মধ্যে কোনও রাজনৈতিক রং ছিল না। অগ্রজ, অনুজ, পরিচালক, অভিনেতা এমন কোনও ভেদাভেদ ছিল না। সবাই একটা পরিবার হিসেবে রাহুলকে লেখক হিসেবে ভালবেসে, বন্ধু হিসেবে ভালবেসে, ছোট ভাইয়ের মতো ভালবেসে পাশে ছিলেন। তারা একই সুরে কথা বলেছেন, রং বা বর্ণের ভেদাভেদ ছিল না। যারা পাশে ছিলেন তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।

প্রশ্ন: নতুন সরকারের কাছে কী প্রত্যাশা?

প্রিয়াঙ্কা: আমি খুবই আশাবাদী। সবার মতোই বিশ্বাস করি, ভাল কাজ হবে ইন্ডাস্ট্রিতে। আমি চাই অনেক সংখ্যায় কাজ হোক। আমরা সবাই কাজ করার যেন সুযোগ পাই।

প্রশ্ন:‘সহজ কথা’-র ভবিষ্যৎ কী ?

প্রিয়াঙ্কা: খুব কঠিন বিষয় আসলে। অনেকেই সহজকে আর আমাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে বলছেন। আসলে সহজের থেকে এটা আশা করা অন্যায় হয়ে যাবে। কারণ, ও তো ১২ বছরের একটা বাচ্চা। আমার মনে হয়, রাহুলের এত বছরের গড়ে তোলা, ওর পরিশ্রম, ওর অধ্যবসায়, শিক্ষা, পড়াশোনা সব কিছুর জন্যই সম্ভব হয়েছে। মানুষকে বিশেষ অনুভব করাতে পারত রাহুল। আমি এটা পারব না। আমি চাই এটা চলুক। কিন্তু কী ভাবে সেটা এখনও ভেবে উঠতে পারিনি।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *