আর্জেন্টিনা জয় বের করে নেয়

স্পোর্টস ডেস্ক :

কখনও ইংল্যান্ড গোলরক্ষক দুর্দান্তভাবে ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন প্রচেষ্টা, কখনও বল লাগছিল পোস্টে। একটু একটু করে ফুরিয়ে আসছিল সময়। চোখ রাঙাচ্ছিল বিদায়ের শঙ্কা। কিন্তু এই আর্জেন্টিনা দল হাল ছাড়ে না, হারার আগে হারে না। সেই বিজয়ী মানসিকতায় লড়াই করেই গোলের দেখা পেল তারা, সাত মিনিটের মধ্যে দুটি। আরেকটি ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লিখে আর্জেন্টিনা দেখিয়ে দিল, কেন তারা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন!

আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমি-ফাইনাল, আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড, বৈরি রাজনৈতিক ইতিহাস ও ফুটবলীয় বিতর্কের কারণে যে দুই দলের লড়াই সবসময়ই ছড়ায় বাড়তি উত্তেজনা। ম্যাচের প্রথমার্ধের পুরোটা সময় যেন সেটিরই প্রদর্শনী দেখা গেল। দুই দলের শারীরিক শক্তি নির্ভর লড়াইয়ে সৌন্দর্য হারাল ফুটবল।

কিন্তু মুদ্রার তো দুটি পিঠ। এই ম্যাচও যেন তাই। দ্বিতীয়ার্ধে দেখা মিলল সুন্দর ফুটবলের। দারুণ এক আক্রমণে অ্যান্থনি গর্ডনের চমৎকার ফিনিশিংয়ে ৫৫তম মিনিটে এগিয়ে গেল ইংল্যান্ড। ছয় দশকের মধ্যে প্রথমবার ইংলিশদের বিশ্বকাপের ফাইনালে যাওয়ার স্বপ্নটাও জোর ভিত পেল।

ওই ধাক্কায় আর্জেন্টিনারও যেন হুঁশ ফিরল। আক্রমণের জোয়ারে ভাসিয়ে দিতে থাকল ইংল্যান্ডকে। কিন্তু গোল মিলছিল না কিছুতেই। ইংল্যান্ড গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডের বিশ্বমানের সব সেভ আর পোস্ট-দুর্ভাগ্য হতাশ করছিল আলবিসেলেস্তেদের।

বুলেট গতির শটে দলকে সমতায় ফিরিয়ে ছুটছেন এন্সো ফের্নান্দেস। ছবি: রয়টার্স
বুলেট গতির শটে দলকে সমতায় ফিরিয়ে ছুটছেন এন্সো ফের্নান্দেস। ছবি: রয়টার্স

কিন্তু আর্জেন্টিনার তো আছে লিওনেল মেসি নামের এক ছোট্ট জাদুকর, যিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুইশর বেশি ম্যাচ খেলে ফেলার পর প্রথমবার খেলতে নামেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।

ম্যাচের ৮৫তম মিনিট। ছোট করে নেওয়া কর্নারে রদ্রিগো দে পলের সঙ্গে বল দেওয়া-নেওয়া করে বক্সের বাইরে মেসি খুঁজে নিলেন এন্সো ফের্নান্দেসকে। এই মিডফিল্ডার পিকফোর্ডের দিকে একবার তাকালেন, ডান পায়ে নিলেন জোরাল শট, বল আশ্রয় খুঁজে নিল জালে। উল্লাসে ফেটে পড়ল গোটা স্টেডিয়াম। আর্জেন্টিনা পেয়ে গেল ঘুরে দাঁড়ানোর পথ।

নির্ধারিত নব্বই মিনিট পেরিয়ে যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটের খেলা চলছিল তখন। আরও একবার একই কাজ করলেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের রেকর্ড গোলস্কোরার মেসি। বক্সের বাইরে ডান দিকে আর্জেন্টিনা অধিনায়ককে আটকাতে গেলেন ইংল্যান্ডের দুই ডিফেন্ডার। কিন্তু মেসি ঠিকই জায়গা খুঁজে নিলেন, বাড়ালেন মাপা এক ক্রস। আর হেডে বল জালে পাঠালেন লাউতারো মার্তিনেস। এই গোলই আর্জেন্টিনাকে পৌঁছে দিল টানা দ্বিতীয় ফাইনালে।

খেলোয়াড়রা যেমন তাদের কাজটা করেছেন ঠিকঠাক, আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিও দলকে বিশ্বকাপে টিকিয়ে রাখার জন্য সঠিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছেন ডাগআউট থেকে। এদিন শুরুর একাদশে একটি প্রশ্নবিদ্ধ পরিবর্তন করেন তিনি। মিডফিল্ডার দে পলকে বাইরে রেখে একাদশে সুযোগ দেন উইঙ্গার জুলিয়ানো সিমেওনেকে, যিনি কিছুই করতে পারেননি।

ওই ভুলটা দ্বিতীয়ার্ধে শুধরে নেন স্কালোনি। সিমেওনেকে তুলে মাঠে নামান দে পলকে। আক্রমণ গড়ে দেয়ায় ভালো ভূমিকা রাখেন অভিজ্ঞ এই ফুটবলার। নিকোলা হন্সালেস বদলি নেমেও আক্রমণে রাখতে থাকেন প্রভাব।

তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা স্কালোনি আনেন ৮১তম মিনিটে। বিশ্বকাপে টিকে থাকতে প্রয়োজন গোল। তাই ডিফেন্ডার নিকোলাস তালিয়াফিকোকে তুলে নামিয়ে দেন স্ট্রাইকার লাউতারো মার্তিনেসকে। এটিই ঘুরিয়ে দেয় খেলার মোড়। ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগকে বেশ কয়েকবার সমস্যায় ফেলেন মার্তিনেস। এরপর যোগ করা সময়ে তার ওই জয়সূচক গোল।

এটা ঠিক যে, এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোল আর্জেন্টিনার- সেমি-ফাইনাল পর্যন্ত ১৯টি। কিন্তু এই আর্জেন্টিনা ভয়ঙ্কর কোনো দল নয়, তবে জয়ের পথ তারা খুঁজে নেয় ঠিকই।

সবশেষ চারটি ম্যাচই যেমন। শেষ বত্রিশে নবাগত কেইপ ভার্ডের বিপক্ষে দুইবার এগিয়ে গিয়ে লিড হারানো, ১২০ মিনিটের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে জিতে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে তিনবারের বিশ্বকাপ জয়ীরা।

শেষ ষোলোয় মিশরের বিপক্ষে ৬৭ মিনিটের মধ্যে আর্জেন্টিনা পিছিয়ে পড়ে ২-০ গোলে। ম্যাচের আগে এমন কিছু অনেকের কাছেই ছিল কল্পনাতীত। ৭৮ মিনিট পর্যন্তও স্কোরলাইন ছিল একই।

আর্জেন্টিনার ভক্ত-সমর্থকরা অনেকেই হয়তো ততক্ষণে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু খেলোয়াড়দের মাঝে ছিল বিশ্বাস। তাই তো পরের সময়টায় রচিত হয় বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা প্রত্যাবর্তনের গল্পগুলোর একটি। ১৩ মিনিটের এক ঝড়ে তিন গোল করে অবিশ্বাস্য জয় তুলে নেয় আর্জেন্টিনা।

সেদিনের ম্যাচে রেফারিং নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অনেক। কিন্তু আর্জেন্টিনা তাদের কাজটা করেছে ঠিকঠাক। তাই ওভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কৃতিত্বটুকু তাদের প্রাপ্য। ফুটবলে এমন কিছু প্রতিদিন হয় না!

কোয়ার্টার-ফাইনালে আর্জেন্টিনার সামনে ছিল সুইজারল্যান্ড। ম্যাচের শুরুতেই এগিয়ে যায় ২০২২ সালের চ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু খেলায় কোনো ধারই ছিল তাদের। দারুণভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে সুইসরা। ৬৭তম মিনিটে সমতাও ফেরায় তারা। একটু পরই তারা পরিণত হয় ১০ জনের দলে। তারপরও আর্জেন্টিনা দ্বিতীয় গোলের পথ খুঁজে পাচ্ছিল না।

বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখা থেকে আর একটি জয় দূরে আর্জেন্টিনা। ছবি: রয়টার্স
বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখা থেকে আর একটি জয় দূরে আর্জেন্টিনা। ছবি: রয়টার্স

অবশেষে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচের ১১২তম মিনিটে চোখধাঁধানো এক গোলে সব শঙ্কা উড়িয়ে দেন হুলিয়ান আলভারেস। শেষ দিকে লাউতারো মার্তিনেসের গোলে নিশ্চিত হয়ে যায় জয়।

সেই মার্তিনেস পরের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও করলেন মহামূল্যবান একটি গোল। তাতে আর্জেন্টিনার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পে যেমন যোগ হলো নতুন অধ্যায়, তেমনি টিকে রইল শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্নও।

আর্জেন্টিনার একটি ধারাও অক্ষত থাকল। ছয়বার বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে খেলে প্রতিবারই তারা জায়গা করে নিল ফাইনালে। দীর্ঘ এক খরাও কাটল। ১৯৯০ আসরের শেষ ষোলোয় ব্রাজিলকে হারানোর পর, এই প্রথম বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ী কোনো দলকে নির্ধারিত ৯০ মিনিট বা অতিরিক্ত সময়ে হারাতে পারল আর্জেন্টিনা। এই দুটি জয়ের মাঝে বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন দলগুলোর বিপক্ষে ৯ ম্যাচ খেলে যে তিনটি তারা জিততে পেরেছিল, তিনটিই ছিল টাইব্রেকারে।

১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর আর কোনো দল টানা দুটি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। সেই ইতিহাসও এখন ডাকছে আর্জেন্টিনাকে।

রোববার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শিরোপা লড়াইয়ে তাদের সামনে ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়ন স্পেন।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *