আরও একটি জুলাই চলে যাচ্ছে। তিন বছর আগেও জুলাই আমাদের মনে দাগ কাটার মত কোনো মাস ছিল না। ২০২৪ সালে এই মাসটি বাংলাদেশের ইতিহাসের উজ্জ্বল পাতায় ঠাঁই করে নেয়। এরপর থেকেই জুলাই এলে দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের ভিতরে শৌর্য, গৌরব, শোক, প্রেরণা, প্রত্যাশার মিশ্র অনুভূতির যোগান দিয়ে যায়। সাথে রেখে যায় কিছু প্রশ্ন। ২০২৪ এর জুলাইয়ে কী চেয়েছিল বাংলার মানুষ? বেশিদিন তো গত হলো না, কী পাচ্ছে সেই মানুষগুলো দুই বছর পরে? একটি জাতির ইতিহাস পরিক্রমায় কিছু কিছু দিন, মাস কিংবা বছর কালপঞ্জির সাধারণ সীমানা ছাড়িয়ে লাল কালিতে জ্বলজ্বল করে। আমাদের রয়েছে ১৭৫৭ সালের পলাশী প্রান্তরের হৃদয়বিদারী ট্র্যাজেডি, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তে রাঙানো ভাষার অধিকার অর্জনের গৌরব, ১৯৬৯ সালের অগ্নিগর্ভ গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ- যার উত্তাল মার্চ, বিজয়ের ১৬ই ডিসেম্বর আমাদের স্বাধীন সত্তার মূল ভিত্তি। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা মোড় পরিবর্তনকারী অধ্যায় হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি মাস বা একটি বিশেষ ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জনগণের এক ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ। ২০২৪ সালের ১ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির যুক্তিসঙ্গত সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের যে প্রতিবাদ সূচিত হয়েছিল, তা দ্রুতই এক সর্বাত্মক জাতীয় বিদ্রোহে রূপ নেয় এবং ৫ আগস্ট তার চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। প্রাথমিক দাবিটি নিয়োগসংক্রান্ত নীতির হলেও খুব দ্রুতই তা গণতন্ত্র, সুশাসন, নাগরিক অধিকার, জবাবদিহি ও আইনের শাসনের প্রতি সুগভীর জনআকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশে রূপ নেয়। বহুবছর ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক অধিকারহীনতা, ভোটাধিকার হরণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে রাখার প্রচেষ্টা সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে পীড়িত করছিল। ১৬ জুলাই রংপুরে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো আবু সাঈদ ও পরে ঢাকায় মুগ্ধ হত্যাকাণ্ডের পর নিরীহ ছাত্র আন্দোলন রূপ নেয় ফুঁসে ওঠা জনসমুদ্রে। এই গণআন্দোলন তার সর্বজনীন বৈচিত্র্য থেকেই মূল শক্তি অর্জন করেছিল। রাজপথে মা-বোনদের উপস্থিতি আন্দোলনকে এনে দিয়েছিল নৈতিক দৃঢ়তা। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা যেমন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তেমনি কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, আইনজীবী ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ ব্যাপক সংখ্যায় রাজপথে নেমে এসেছিলেন। ধীরে ধীরে তা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ গণসংগ্রামে পরিণত হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই প্রবল অসন্তোষের শিকড় খুঁজে পান জুলাই-পূর্ববর্তী দেড় দশকের ধারাবাহিক ঘটনাবলিতে। সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অভাব এবং রাজনৈতিক সংঘাত সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তীব্র হতাশার জন্ম দিয়েছিল। ভিতরে ভিতরে সংকট বাড়ছিল বৈ কমছিল না। এমন প্রেক্ষাপটে কোটা আন্দোলনটি একটি অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজ করে। এটি দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ ক্ষোভকে এক মুহূর্তে জাতীয় পরিবর্তনের দাবিতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেয়। আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে জুলাইয়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তরাধিকার নিয়ে নানামুখী প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা তৈরি হয়েছে। জুলাই ছিল সমগ্র জনগণের যৌথ অর্জন। জুলাইয়ের গণঐক্য আমাদের শিখিয়েছে যে, বিভাজন ভুলে অন্যায় ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়াই জাতির মূল শক্তি। জুলাইয়ের মূল চেতনা হলো- কোনো আধিপত্যবাদী বা শোষক শক্তির কাছে কখনো মাথা নত না করা। সাম্প্রতিক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ' নীতিকে সামনে রেখে দেশকে পুনর্গঠন করে মাথা উঁচু রেখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে হাত দেন। দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে তার হাত ধরে। তার প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে এই নীতি প্রতিফলিত হয়েছে। জুলাইয়ের অন্যতম মূল লক্ষ্য ছিল বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ বিনির্মাণ। এই লক্ষ্যকে কেবল রাজনৈতিক বা নির্বাচনি অঙ্গীকারে সীমাবদ্ধ না রেখে সরকার তিনটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ শুরু করে দিয়েছে। প্রথমত, প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর মাধ্যমে সরাসরি খাদ্য সহায়তা ও অর্থ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে, যা সরাসরি সুবিধাভোগী পরিবারের নারীপ্রধানের হাতে পৌঁছাবে। দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ প্রবর্তন করা হয়েছে; যার মাধ্যমে কৃষকরা সরাসরি সরকারি ভতুর্কি, মানসম্মত বীজ, সার, কীটনাশক এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও বীমাসহ দশ রকমের সুবিধা পাচ্ছেন। তৃতীয়ত, দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি প্রবাসীদের কল্যাণে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করা হয়েছে; যার মাধ্যমে প্রবাসী শ্রমিক ও অভিবাসীরা বিমানবন্দরে বিশেষ মর্যাদা, বিমানবন্দরে পৌঁছানো ও থাকার দ্রুত সেবা, রেমিট্যান্সে বাড়তি প্রণোদনা, কম খরচে প্রবাসী ঋণ, আইনি সহায়তা এবং দেশে ফেরার পর পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট আর্থিক সুরক্ষা সুবিধা পাবেন। সামাজিক সুরক্ষার পাশাপাশি পরিবেশ ও টেকসই অবকাঠামো গঠনে দেশব্যাপী খাল খনন ও পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ অভিযান চলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, সাধারণ কৃষক এবং দেশের বিপুল বেকার যুবসমাজ এই কর্মসূচির সরাসরি সুবিধাভোগী। দেশব্যাপী স্থগিত হওয়া খাল ও জলাশয় পুনঃখননের ফলে কৃষিজমিতে সময়মতো সেচ সুবিধা নিশ্চিত হচ্ছে, জলাবদ্ধতা দূর হচ্ছে এবং বর্ষা মৌসুমে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস পাচ্ছে। একই সাথে খাল খনন প্রকল্পে গ্রামীণ এলাকার হাজার হাজার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সারা দেশে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের ব্যাপক রোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা দেশের পরিবেশ সংরক্ষণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক নিরাপদ, সবুজ ও টেকসই বাংলাদেশ নিশ্চিত করছে। ফলে এমন এক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকার হাত দিয়েছে, যে বাংলাদেশ কারো মুখাপেক্ষী হবে না। একটি স্বনির্ভর জাতি হিসেবে আমাদের মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। জুলাই চেতনার ভাবধারাকে ধারণ করে পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের অংশ হিসেবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬, জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) আইন, ২০২৬, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন আইন, ২০২৬, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২৬, এবং ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬। এসব আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে যুগোপযোগী সংস্কারের ভিত্তি সুদৃঢ় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল পরিসরে নাগরিকের অধিকার নিশ্চিতকরণ, তথ্য ও উপাত্তের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাতের জবাবদিহি ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের কল্যাণ, পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিতকরণ, পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইনগত সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এসব আইন প্রণীত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, এসব আইন রাষ্ট্রীয় সুশাসন, ডিজিটাল নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। জুলাইয়ের চেতনাকে যারা কেবল মুখের কথা, মুখরোচক বক্তৃতা বা কাগজে-কলমে ঘোষণা ও বাণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়, তাদের জন্যই প্রধানমন্ত্রীর বাস্তবভিত্তিক জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ একটি কার্যকর জবাব। জুলাই কেবল স্মরণ করার বিষয় নয়; এটি জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের মাধ্যমে একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার। তাই বিভিন্ন নীতি, আইন ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচির বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই জুলাইয়ের চেতনার প্রকৃত প্রতিফলন ঘটছে। জুলাই-আগস্টের অকুতোভয় শহীদদের আত্মদান কোনো প্রতীকী স্মৃতিচারণের বিষয় নয়; বরং বৈষম্যহীন, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গঠনের প্রেরণা। নতুন বাংলাদেশের দর্শন ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশ-কেউ পিছিয়ে থাকবে না, কেউ অবহেলিত থাকবে না।’ এই আদর্শকে সামনে রেখে জনগণের কল্যাণ, সমঅধিকার ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই জুলাইয়ের শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইতিহাসের ধারায় এই অর্জনই জুলাইকে জাতির চেতনা ও অগ্রযাত্রার এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। -লেখক: সরকারি কর্মকর্তা -পি. ফি. Post Views: 26 Post navigation মানব পাচার: স্বপ্ন নয়, মৃত্যুর ফাঁদ-মো. মোকাম্মেল হোসেন