শুধু খাবারের উৎস নয়, বিভিন্ন কারণে এক সময় ম্যামথ হয়ে উঠেছিল মানুষের পছন্দের শিকার। এদের লোমশ চামড়া দিয়ে পোশাক তৈরি করতে পারতেন শিকারি-সংগ্রাহকেরা। দাঁত-হাড় দিয়ে বানানো যেত অস্ত্র।

নিউটার্ন ডেস্ক :

আজ থেকে প্রায় ২০-৩০ হাজার বছর আগের কথা। তত দিনে আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয়ে গিয়েছে পৃথিবীতে। তবে তারা চাষাবাদ শিখে ওঠেননি। তখনও শিকার করে এবং ফলমূল সংগ্রহ করে খেতেন। এবং সেই শিকারি-সংগ্রাহকদের মধ্যে ছিল বুদ্ধিমত্তার ছাপ। কোন প্রাণী শিকার করলে বেশি লাভ হবে— সেই বুঝে বেছে নিতেন শিকারকে। যেমন পুরুষ ম্যামথের তুলনায় স্ত্রী ম্যামথই বেশি শিকার করা হত সে সময়ে। সাম্প্রতিক গবেষণায় তেমনই আভাস মিলেছে।আনন্দবাজার ডট কম

আজ থেকে প্রায় ৫০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে আবির্ভাব হয়েছিল ম্যামথদের। টিকে ছিল প্রায় চার হাজার বছর আগে পর্যন্ত। এর মধ্যে প্লিস্টোসিন যুগে (২৬ লক্ষ বছর আগে শুরু হয়ে ১১ হাজার ৭০০ বছর আগে পর্যন্ত সময়কাল) পৃথিবীর একটি বড় অংশ বরফে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। সে সময়ে বিভিন্ন কারণে শিকারি-সংগ্রাহক মানুষদের পছন্দের শিকার হয়ে উঠেছিল লোমশ ম্যামথ। তার মধ্যেও আবার বেশি শিকার করা হত স্ত্রী ম্যামথদেরই।

সুইডেনের স্টকহোলম বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্ম-জিনতত্ত্ববিদ হ্যানা মুটস এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন। তারা পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, জার্মানি এবং রাশিয়া মিলিয়ে মোট ১১টি এলাকায় পাওয়া ম্যামথ-জীবাশ্মের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করেন।

এই গবেষণার জন্য মোট ৫২১টি ম্যামথের হাড়ের ডিএনএ বিশ্লেষণ করেন হ্যানা এবং তার সহযোগীরা। এর মধ্যে ১০০টি হাড় ছিল শিকারি-সংগ্রাহক মানুষের জড়ো করা। সেগুলি মূলত পাওয়া গেছে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের ১০টি এবং সাইবেরিয়ায় একটি অঞ্চল থেকে। কার্বন ডেটিং করে দেখা গেছে, সেগুলি সবই ২০-৩০ হাজার বছর আগেকার। বাকি ৪২১টি হাড় মিলেছে প্রাকৃতিক পরিবেশে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যে হাড়গুলি মানুষ জড়ো করেছিল, সেখানে ৭০ শতাংশই ছিল স্ত্রী ম্যামথদের। বাকি ৩০ শতাংশ পুরুষ ম্যামথের। আবার প্রাকৃতিক পরিবেশে পাওয়া হাড়গুলির ক্ষেত্রে এই অনুপাত ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। সে ক্ষেত্রে ৬৬ শতাংশ ছিল পুরুষ ম্যামথের, বাকিটা স্ত্রী ম্যামথের। সম্প্রতি ‘কারেন্ট বায়োলজি’ জার্নালে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।

তবে প্রাকৃতিক পরিবেশে পাওয়া হাড় এবং মানুষের জড়ো করা হাড়ের নমুনায় এমন লিঙ্গবৈষম্যের কারণ কি? তা হলে কি ওই সময়ের শিকারি-সংগ্রাহকেরা স্ত্রী ম্যামথদেরই বেশি শিকার করত? তেমনটাই অনুমান করছেন গবেষকরা। কিন্ত কেন? কী কারণে এমন বাছাই করে শিকার করা হত? সে উত্তর এখনও অস্পষ্ট। হ্যানার কথায়, “আমরা এখনও এর উত্তর খুঁজে যাচ্ছি।” স্পষ্ট কোনও ধারণা না মিললেও এমন বাছাইয়ের নেপথ্যে কয়েকটি সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন হ্যানা।

বর্তমানে যে সব হাতি ঘুরে বেড়ায়, তাদেরই কোনও এক পূর্বপুরুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ম্যামথের পৃথক বংশধারা তৈরি হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে এখনকার হাতির চরিত্রের সঙ্গে ম্যামথদের চরিত্রের কিছু মিল থাকতে পারে বলে অনুমান হ্যানার। তার মতে, ধরে নেয়া যেতে পারে স্ত্রী হাতির মতো স্ত্রী ম্যামথেরাও দল বেঁধে থাকত। ম্যামথের পালে থাকত একাধিক স্ত্রী ম্যামথ এবং তাদের শাবকরা। নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যেই ঘোরাফেরা করত। অন্য দিকে পুরুষ হাতির মতো পুরুষ ম্যামথেরাও সম্ভবত একা একা এবং তুলনামূলক বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ঘুরে বেড়াত। ফলে পুরুষ ম্যামথের তুলনায় স্ত্রী ম্যামথের পাল কোথায় রয়েছে— তা খুঁজে বের করতে সুবিধা হত শিকারি-সংগ্রাহক মানুষদের। হ্যানার অনুমান, সেই কারণেই স্ত্রী ম্যামথরা বেশি শিকার হত।

এ ছাড়া পুরুষ ম্যামথের চেয়ে স্ত্রী ম্যামথ আকারে কিছুটা ছোট হত। ওজনও কম হত। একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ ম্যামথের ওজন হত প্রায় ৬ টন। স্ত্রী ম্যামথদের ওজন হত ৪ টনের আশপাশে। ফলে তাদের শিকার করা সম্ভবত কিছুটা সহজ ছিল বলে মনে করছেন গবেষকদলের অন্যতম সদস্য তথা বিবর্তনীমূলক জিনগবেষক লাভ ডালেন। শিকার হিসেবে স্ত্রী ম্যামথদের বেছে নেয়ার নেপথ্যে এটি একটি অন্যতম কারণ হতে পারে বলে অনুমান তার।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *