নিউটার্ন ডেস্ক :“অনেকদিন ধরেই আমার হাতে ও পেটে দুই জায়গায় চামড়ার নিচে ছোট দলার মতো হয়ে আছে, ব্যথা নেই তবে চাপ দিলে নড়াচড়া করে। এখন শরীরের বিভিন্ন জায়গায় এরকম আরও অনেকগুলো দলা নতুন করে হয়েছে।” বিবিসি বাংলাকে এভাবেই বলছিলেন ঢাকার রামপুরা এলাকার বাসিন্দা মিঠুন শিকদার। তিনি জানান, কখনও ব্যথা অনুভূত না হলেও এগুলো টিউমার কিনা সেটি নিয়ে চিন্তা হচ্ছে তার। শরীরে চামড়ার নিচে এই ধরনের পিণ্ড বা দলা আসলে কী? এ নিয়ে কি চিন্তার কোনো কারণ আছে? এমন নানা প্রশ্ন রয়েছে অনেকেরই।বিবিসি মানুষের শরীরে চামড়ার নিচে ছোট, নরম ও গোলাকার একটি বা একাধিক পিণ্ডের মতো এই বস্তুকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় লাইপোমা বা লিপোমা বলা হয়। এই ধরনের নরম পিণ্ডের ওপর আঙুল দিয়ে চাপ দিলে এটি খুব সহজেই নড়াচড়া করছে বলে অনুভূত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন এবং ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের গবেষকদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, মানবদেহের নরম টিস্যু টিউমারগুলোর মধ্যে লাইপোমা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বিশ্বের প্রতি এক হাজার মানুষের মধ্যে অন্তত একজনের শরীরে এটি থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, এটি চর্বি বা মেদ দিয়ে গঠিত এক ধরনের ‘বিনাইন’ বা নির্দোষ টিউমার, যা ক্ষতিকর নয়। তাদের মতে, কিছু বিশেষ কারণ ছাড়া এর জন্য মেডিসিন বা সার্জিকাল কোনো চিকিৎসারও প্রয়োজন নেই। লাইপোমা কেন হয়?লাইপোমা হওয়ার কারণ সুনির্দিষ্ট নয় বলেই মত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের। তবে তারা বলছেন, এটি এক ধরনের টিউমার। “অন্যান্য বেশিরভাগ টিউমার হওয়ার খুব বেশি কারণ যেমন জানা যায় না, লাইপোমার ক্ষেত্রেও ওই রকম,” বিবিসি বাংলাকে বলেন বাংলাদেশের ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান। যদিও লাইপোমার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক চিহ্নিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন এর গবেষকরা। তাদের গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, এর বড় কারণ হলো জেনেটিক মিউটেশন। অর্থাৎ পরিবারের কারো লাইপোমা থাকলে অন্যদের হওয়ার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেশি হয়। এছাড়া শরীরের কোনো জায়গায় সরাসরি জোরে আঘাত লাগলে সেখানকার চর্বি কোষের মৃত্যু ঘটে এবং পরবর্তীতে প্রদাহের মাধ্যমে সেখানে লাইপোমা তৈরি হতে পারে। সাধারণত ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। তবে শিশু বা কিশোরদেরও এটি হতে পারে বলে দাবি গবেষকদের। তারা বলছে, বেশি মোটা হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত মদ্যপান, লিভারের রোগ এবং রক্তে চিনির মাত্রা বেড়ে যাওয়া বা গ্লুকোজ ইনটলারেন্সের সাথে এর যোগসূত্র রয়েছে। লাইপোমা চেনার উপায়লাইপোমা হলো মূলত পরিপক্ক চর্বি কোষের একটি সমষ্টি। এটি একটি পাতলা তন্তুময় আবরণে বা ‘ফাইব্রাস ক্যাপসুল’-এ ঘেরা থাকে। এটি সাধারণত চামড়ার নিচের স্তরে থাকে। তবে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ যেমন- পাকস্থলী, অন্ত্র এবং মাংসপেশির গভীরেও এটি হতে পারে। কানাডার শল্য চিকিৎসকদের প্ল্যাটফর্ম দ্যা সেন্টার ফর মাইনর সার্জারি বলছে, এই পিণ্ডগুলো আকারে ভিন্ন হতে পারে, মটরদানার মতো ছোট থেকে শুরু করে কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত ব্যাসবিশিষ্ট হয়ে থাকে। এটি সাধারণত ঘাড়, কাঁধ, পিঠ, বাহু, পেট বা উরুতে বেশি দেখা যায়। আঙুল দিয়ে চাপ দিলে এটি চামড়ার নিচে পিছলে যায় বা নড়ে ওঠে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি এক সেন্টিমিটার থেকে দুই ইঞ্চি ব্যাসের হয়। তবে কখনও কখনও এটি ছয় ইঞ্চি বা তার বেশি বড় হতে পারে, যাকে ‘জায়ান্ট লাইপোমা’ বলা হয় বলে মত যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন এর গবেষকদের। চিকিৎসকরা বলছেন, ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে লাইপোমা ব্যথাহীন। তবে যদি এটি কোনো নার্ভ বা স্নায়ুর ওপর চাপ দেয় বা এর ভেতরে রক্তনালীর পরিমাণ বেশি থাকে, তবে ব্যথা হতে পারে। লাইপোমা থেকে ক্যান্সার হতে পারে?লাইপোমা নিয়ে মানুষের সবচেয়ে বড় ভীতি হলো ক্যান্সার। গবেষকরা বলছেন, লাইপোমা ক্যান্সারে রূপ নেয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। তবে লিপোসারকোমা নামক এক ধরনের ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যান্সারযুক্ত টিউমার দেখতে হুবহু লাইপোমার মতোই। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন এর গবেষকরা বলছেন, যদি কোনো চর্বির দলা খুব দ্রুত বড় হতে থাকে, অতিরিক্ত শক্ত হয়ে যায় এবং নড়াচড়া না করে, তবে তা লিপোসারকোমা হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আর এ কারণেই ব্যথা হলে বা টিউমার শক্ত ও বড় হতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার কথা বলছেন ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান। মি. রহমান বলছেন, “লাইপোমা শরীরের একটি নির্দোষ অংশ মাত্র। তবে শরীরের কোথাও কোনো চাকা বা পিণ্ডে ব্যথা অনুভব করেন, তবে শুরুতে একবার একজন সার্জন বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখিয়ে নিন।” তিনি বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা কেবল শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমেই লাইপোমা সনাক্ত করতে পারেন। তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে জিনের পরীক্ষা বা বায়োপসি করেও এই পার্থক্য নিশ্চিত করা হয়। কখন অপারেশন জরুরি?অনেকের শরীরেই একাধিক লাইপোমা থাকে, যা অনেক সময় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চিকিৎসকরা বলছেন, কারো কারো শরীরে দুইশো-চারশো লাইপোমাও হতে পারে। হাত দিয়ে স্পর্শ করলে বোঝা যায়, সাধারণত এর কোনো উপসর্গ থাকে না। ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, এটি যদি কোনো শারীরিক সমস্যা তৈরি না করে, তাহলে চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। তবে পিণ্ডটি যদি দ্রুত বড় হতে থাকে, তীব্র ব্যথা বা অস্বস্তি হয়, সৌন্দর্যহানি ঘটে, জয়েন্ট বা মাংসপেশির স্বাভাবিক নড়াচড়ায় বাধা দেয় তখন অনেকে এটি অপসারণ করে থকেন। “যদি এমন কোনো জায়গায় লাইপোমা হলো যে দেখতে খারাপ মনে হচ্ছে, দ্বিতীয়ত কোনো প্রেশার এলাকা- অর্থাৎ বসার বা শোবার সময় চাপ পড়ে, এমন জায়গায় লাইপোমা হলে অপারেশন করা লাগতে পারে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন এর গবেষকরা বলছেন, লাইপোমা অপসারণের জন্য একমাত্র উপায় সার্জারি। সবচেয়ে প্রচলিত ও কার্যকর পদ্ধতি হলো সার্জিক্যাল এক্সিশন। যেখানে ছোট একটি ছিদ্র বা কাটার মাধ্যমে লাইপোমা বের করে আনা হয়। এছাড়া লিপোসাকশন এবং স্টেরয়েড ইনজেকশন দিয়েও লাইপোমার আকার সংকুচিত করা যায় বলেও জানান তারা। লাইপোমার বিকল্প চিকিৎসাবড় আকারের লাইপোমা পুরোপুরি নির্মূল করতে আধুনিক সার্জারিই সবচেয়ে নিরাপদ ও স্থায়ী সমাধান বলে মত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং গবেষকদের। তবে অনেকেই লাইপোমা ঠিক করতে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার ওপর আস্থা রাখেন। এক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে চিহ্নিত করা গেলে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় লাইপোমার ক্ষেত্রে ভালো ফলাফল পাওয়া যায় বলে মত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ডা. তাপস কর্মকারের। “লাইপোমা যদি ছোট থাকে তাহলে আমাদের হোমিওপ্যাথি ওষুধেই ভালো রেজাল্ট পাওয়া যায়,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি। লাইপোমা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা কঠিন। তবে খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন ঝুঁকি কমাতে পারে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা, মদ্যপান না করা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করার কথা বলছেন বিশেষেজ্ঞরা। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ডা. তাপস কর্মকার বলছেন, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার খেলে কিংবা রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে গেলে লাইপোমার আকারও বড় হতে পারে। “খাবার মেইনটেইন করলে, ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটিজ বাড়ালে, ব্যায়াম করলে লইপোমা নিয়ন্ত্রণে থাকে বা অনেক সময় এটি বার্ন হয়ে যায়,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি। Article InformationAuthor,সজল দাসRole,বিবিসি নিউজ বাংলা Post Views: 32 Post navigation ঘুমের মধ্যে মানুষ কেন দাঁত কিড়মিড় করে? কাদের হয় আর চিকিৎসা কী?