দিনাজপুর প্রতিনিধি ।।
মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে নিয়ে যাচ্ছে, ৯ বছরের তাসপিয়ার মুখে বলা এই কথাটিই হয়ে রইল তার শেষ কথা। ছোট্ট মেয়েটি জানত না, মাদ্রাসায় যাওয়ার কথা বলে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মৃত্যুর মুখে। রাতের অন্ধকারে নৌকায় করে করতোয়া নদীর মাঝখানে নিয়ে প্রথমে পানিতে ফেলে দেয়া হয় তাকে। কিছুক্ষণ পর মায়া হলে সেই শিশুকেই পানি থেকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরেন সৎ বাবা। কিন্তু সেই মায়া টিকল না বেশিক্ষণ। স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে তাসপিয়াকে আবারও নদীতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে করতোয়া নদী থেকে ৯ বছরের শিশু মসফিয়া আক্তার তাসপিয়ার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এমনই হৃদয়বিদারক তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। তাদের দাবি, পারিবারিক কলহের জেরে তাসফিয়াকে নদীতে ফেলে হত্যা করেছেন তার সৎ বাবা সাফিউল ইসলাম (৪০)। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) গভীর রাতে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার সাফিউল ইসলাম ঘোড়াঘাট উপজেলার ভর্ণাপাড়া এলাকার মোসলেম উদ্দিনের ছেলে। শিশু তাসফিয়ার মৃত্যুর পর আত্মগোপনে চলে যান সৎ বাবা সাফিউল।

পুলিশের তথ্যমতে, রাণীগঞ্জ বাজার থেকে ভ্যানে করে কবিরপুর, এরপর গোবিন্দপুর হয়ে মুসিপাড়ার ঘাটে যান সাফিউল। পরে নদীর বাঁধ ধরে ভর্ণাপাড়া টঙ্গী ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন করতোয়া নদীতে নৌকা নিয়ে প্রবেশ করেন তিনি। সময় তখন রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে। চারপাশ নিস্তব্ধ। নৌকা নদীর মাঝামাঝি পৌঁছালে তাসফিয়াকে পানিতে ফেলে দেয়া হয়। নদীতে ফেলে দেয়ার পর কিছুক্ষণ পর তাসফিয়ার প্রতি মায়া হয় সাফিউলের। পানি থেকে শিশুটিকে তুলে আবারো নৌকায় নেন। বুকে জড়িয়ে ধরেন তাকে।এরপর নৌকা নিয়ে তীরে ফিরে আসেন। কিন্তু তীরেই ঘটে যায় আরও ভয়াবহ ঘটনা। তীরে ফেরার পর মোবাইল ফোনে স্ত্রী লিজার সঙ্গে সাফিউলের কথা কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার মধ্যে ক্ষুব্ধ হয়ে তাসফিয়াকে তীরের কাছেই নদীতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন তিনি। এরপর করতোয়ার কালো পানিতে হারিয়ে যায় শিশুটি।

পরদিন সোমবার সন্ধ্যায় করতোয়া নদীতে তাসফিয়ার মরদেহ ভেসে ওঠে। স্থানীয়রা মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে।
স্থানীয় ও পুলিশের ভাষ্য, ঢাকায় থাকা অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। সময়ের সঙ্গে সেই বিরোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। গত ৯ আগস্ট ঢাকা থেকে বাড়িতে ফেরেন সাফিউল। এরপর ১৪ আগস্ট শুক্রবার তাসফিয়াকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর জন্য বিন্যাগাড়ি রোডের জোবাইদা মহিলা মাদ্রাসায় রেখে আসেন তিনি।পরে রোববার বিকেলে ভর্তি-সংক্রান্ত ছবি তোলার কথা বলে তাসফিয়াকে সেখান থেকে নিয়ে আসেন সাফিউল।ওই দিন রাত ৯টা ১৬ মিনিটে তাসফিয়া নিজেই ফোন করে আগের মাদ্রাসায় জানায়, তাকে অন্য একটি মাদ্রাসায় রাখা হয়েছে। কিন্তু এরপর মাদ্রাসার পথে না গিয়ে শিশুটিকে নিয়ে একের পর এক জায়গা বদলাতে থাকেন সাফিউল।

এদিকে তাসফিয়ার জীবনও ছিল ভাঙা সংসারের গল্পে মোড়া। তার মা লিজার সঙ্গে বাবা মমিনুলের বিচ্ছেদ হয় ২০২২ সালে। এরপর তাসফিয়া আপন বাবার কাছেই থাকত। পরে লিজা সাফিউল ইসলামকে বিয়ে করেন। ২০২৫ সালের দিকে পরিবারের অগোচরে তাসফিয়াকে দ্বিতীয় স্বামীর কাছে নিয়ে আসেন তিনি।

এরপর শিশুটিকে সৎ দাদা-দাদির কাছে রেখে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় চলে যান লিজা ও সাফিউল। লিজা পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। আর সাফিউল চালাতেন রিকশা। অভাবের সংসারে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে দাম্পত্য কলহও।

ঘোড়াঘাট থানার ওসি শহিদুল ইসলাম বলেন, শিশু তাসফিয়া হত্যার ঘটনায় তার সৎ বাবা সাফিউল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় শিশুটির নিজের বাবা বাদি হয়ে এজাহার দায়ের করেছেন। আজ বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *