দক্ষিণ আমেরিকার আন্দেস পর্বতমালা। সেখান থেকে তুলে আনা বরফের টুকরোয় ধরা পড়ল মিথেন গ্যাসের প্রায় ২০০০ বছরের ইতিহাস। জানা গেল, শিল্পায়নের বহু আগে থেকেই ক্রান্তীয় অঞ্চল ছিল মিথেনের প্রধান উৎস।

নিউটার্ন ডেস্ক :

পৃথিবীর উষ্ণায়নের অন্যতম কারণ মিথেন গ্যাস। শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই গ্যাসের পরিমাণ আরও বেড়েছে। তবে শিল্পায়নের আগে কেমন ছিল পরিস্থিতি? তা নিয়ে এত দিন বিজ্ঞানীরা শুধু অনুমানই করে গিয়েছিলেন। এ বার সেই অনুমান ‘সত্যি’ প্রমাণিত হল। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হলেন, শিল্পের বিকাশের বহু আগে থেকেই ক্রান্তীয় অঞ্চল ছিল পৃথিবীর মিথেন গ্যাসের প্রধান উৎস।আনন্দবাজার ডট কম

কার্বন ডাই অক্সাইডের পর যে গ্রিন হাউস গ্যাস পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়, তা মিথেন। গ্রিন হাউস গ্যাস বলতে বোঝায়, যে সব গ্যাস সূর্যের তাপ শোষণ করে বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। কাচের তৈরি গ্রিনহাউস বা নার্সারির মতো এই গ্যাসগুলিও সূর্যের তাপকে পৃথিবী থেকে ফিরে যাওয়া আটকায়। কার্বন ডাই অক্সাইডের তুলনায় প্রায় ২৮ গুণ তাপ ধরে রাখতে পারে মিথেন।

বর্তমান পৃথিবীতে ক্রান্তীয় অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি তৈরি হয়। শিল্পের যত বিকাশ হয়েছে, সেই সঙ্গে বাতাসে মিথেন নির্গমনও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু শিল্পায়নের আগে? তখন কী ছিল মিথেন গ্যাসের প্রধান উৎস (শিল্পের বিকাশ এক এক এলাকায় এক এক সময়ে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গবেষণায় ব্রিটেনে শিল্পায়নের আগের সময়কালকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, ১৭৬০ সালের আগের সময়কাল)? বিজ্ঞানীদের অনুমান ছিল, তখনও ক্রান্তীয় অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি মিথেন তৈরি হত। কারণ, এই অঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি। প্রচুর বৃষ্টিপাতও হয়। ফলে আর্দ্রতার কারণে এখানে মিথেন গ্যাস বেশি তৈরি হয়। ক্রান্তীয় অঞ্চলের জলাভূমি, ম্যানগ্রোভ অরণ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়া জৈব পদার্থ পচিয়ে প্রচুর পরিমাণে মিথেন গ্যাস তৈরি করে। সেই কারণে বিজ্ঞানীদের অনুমান ছিল, শিল্পায়নের আগেও ক্রান্তীয় অঞ্চলই সম্ভবত মিথেনের প্রধান উৎস ছিল। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনও প্রামাণ্য তথ্য ছিল না তাদের কাছে।

অত প্রাচীন কালে বায়ুমণ্ডল কেমন ছিল, তা বোঝা যায় ‘আইস কোর’ বিশ্লেষণ করে। ‘আইস কোর’ হল হিমবাহ খনন করে তুলে আনা নলাকার লম্বাটে বরফের টুকরো, যার মধ্যে ওই হিমবাহের হাজার হাজার বছরের পুরনো স্তর রয়েছে। এই আইস কোরের মধ্যে আটকে থাকে প্রাচীন কালের বাতাসের বুদবুদ। এগুলি বিশ্লেষণ করে অতীতের জলবায়ু, গ্রিনহাউস গ্যাস, আবহাওয়া-সহ বিভিন্ন বিষয়ে জানতে পারেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু এত দিন যত ‘আইস কোর’ পাওয়া গিয়েছে, তার বেশির ভাগই মিলেছে গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকা থেকে। এই দু’টি জায়গাই বিষুবরেখা থেকে বহু দূরে অবস্থিত। আর বেশির ভাগ মিথেন গ্যাস তৈরি হয় ক্রান্তীয় অঞ্চলেই।

প্রাচীন কালের মিথেনের উৎস নিয়ে এই ধোঁয়াশা কাটিয়েছে আন্দেস পর্বতমালার এক টুকরো বরফ। পেরুতে আন্দেস পর্বতমালার (ক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থিত পর্বত) নেভাদো উয়াসকারান পর্বতশৃঙ্গ থেকে পাওয়া একটি ‘আইস কোর’ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন ওহিও স্টেট ইউনিভার্সিটির বার্ড পোলার অ্যান্ড রিসার্চ ক্লাইমেট সেন্টারের গবেষক কারা লামান্তিয়া। তারা ওই বরফের টুকরোয় আটকে থাকা বাতাসের বুদবুদ থেকে প্রায় ২০০০ বছরের মিথেন গ্যাসের তথ্য সংগ্রহ করেছেন। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শিল্পায়নের আগে ক্রান্তীয় অঞ্চলেই ছিল মিথেন গ্যাসের প্রধান প্রাকৃতিক উৎস। তবে যতটা ভাবা হত, তার চেয়ে বেশি মিথেন নির্গত হত ওই সময়ে।

কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, মেরু অঞ্চল থেকে যে পরিমাণ মিথেন তৈরি হয়, ক্রান্তীয় অঞ্চলে তার প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি মিথেন তৈরি হয়। লামান্তিয়া এবং তার সহযোগীদের এই গবেষণাটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার’ জার্নালে।

গবেষণায় দেখা যায়, খ্রিস্টাব্দ গণনার শুরু থেকে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত দুই মেরুর তুলনায় ক্রান্তীয় অঞ্চলেই মিথেন গ্যাসের ঘনত্ব বেশি ছিল। এর জন্য তাঁরা গ্রিনল্যান্ডের জিআইএসপি২ ‘আইস কোর’ এবং আন্টার্কটিকার ডব্লিউএআইএস ডিভাইডের ‘আইস কোর’-এর সঙ্গে আন্দেস থেকে পাওয়া ‘আইস কোর’ তুলনা করে দেখেন। দেখা যায়, আন্দেসের নমুনায় গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে ৪৬ গুণ এবং আন্টার্কটিকার চেয়ে ৯৪ গুণ বেশি মিথেন ছিল। গবেষণা অনুযায়ী, ১৭৫০ সালে বাতাসে যে পরিমাণ মিথেন ছিল, এখন তা প্রায় ১৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *