আন্তর্জাতিক ডেস্ক :যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি বাণিজ্যচুক্তিতে উপনীত হওয়ার বদলে আলোচনা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কানাডার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা এমন এক নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে প্রবেশ করেছে, যেখানে দীর্ঘদিনের মিত্র ও অর্থনৈতিক অংশীদার দুটি দেশ ক্রমবর্ধমান এক বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে এবং এর সমাধান কোন দিকে তা স্পষ্ট নয়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি গত রাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত রেখে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একটি চুক্তি স্বাক্ষরের খুব কাছাকাছি থাকার পরও সেখান থেকে সরে আসার এ সিদ্ধান্ত মার্ক কার্নির জন্য এক বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হতে চলেছে। কার্নির হোয়াইট হাউসের আলোচনার টেবিল থেকে সরে দাঁড়ানো বিশ্বনেতাদের মধ্যে প্রথমদিকের একজন এবং পরবর্তীতে এর ফল কী হয় সে দিকে সবার নজর কাড়বে। সম্ভাব্য চুক্তিটি ভেস্তে যাওয়ার জন্য দুই পক্ষই শেষ মুহূর্তের পরিবর্তনকে দায়ী করেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘অতিরিক্ত দাবি করেছে’ কিন্তু ‘প্রতিদানে খুব কম প্রস্তাব দিয়েছে’। অটোয়া যখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও ছাড় আদায়ের চেষ্টা করছে, তখন কার্নিকে কানাডীয়দের বোঝাতে হবে যে, একটি ভালো চুক্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদে কিছু অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নিতে হবে। এদিকে, ট্রাম্পের চরম চাপের কৌশল প্রত্যাখ্যান করে এবং নতুন শুল্কের জবাবে পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর, কার্নিকে কানাডিয়ানদের বোঝাতে হবে যে এ অর্থনৈতিক ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে মেনে নেয়া উচিত। শনিবার তিনি বলেন, “আমরা আত্মবিশ্বাসী যে আমরা কানাডার স্বার্থেই এ পদক্ষেপ নিচ্ছি।” তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্তে শর্ত বদলে ‘ক্ষমতার খেলা’ খেলার অভিযোগ তোলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে কী-না – একজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে মি. কার্নি বলেন, “আপনার ওপর হামলা হলে তবেই আপনি যুদ্ধে আছেন- আমাদের ওপর হামলা হয়েছে।” এরপর ফরাসি ভাষায় তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান এ বাণিজ্য বিরোধ ‘আমাদের ইচ্ছায় হয়নি’। তিনি আরও বলেন, “কানাডা শক্তিশালী, কানাডা প্রস্তুত, কানাডা ঐক্যবদ্ধ”। নিঃসন্দেহে এ পরিস্থিতি সীমান্তের উভয় পাশেই অর্থনৈতিক ক্ষতি করবে। মার্কিন শুল্কের কারণে দেশটির ব্যবসাবাণিজ্য আরও চাপের মুখে পড়বে, পাশাপাশি কানাডার পাল্টা শুল্কও প্রভাব ফেলবে। কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে যায়। আবার বেশ কয়েকটি মার্কিন অঙ্গরাজ্যের জন্য কানাডা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। এসব অঙ্গরাজ্যের মধ্যে মিশিগান, কেনটাকি, ইন্ডিয়ানা ও ওহাইও রয়েছে, যারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে। মি. কার্নি ক্ষমতায় আসার সময় আইস হকিতে ব্যবহৃত একটি শব্দ ‘এলবোস আপ’ অর্থাৎ আক্রমণাত্মকভাবে প্রতিরোধ করা – সামনে এনেছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক চাপ এবং তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বিরুদ্ধে কানাডার হয়ে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি সেসময়। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে অনেক কানাডীয় বলেছেন যে, তারা লড়াই করতে প্রস্তুত। সম্প্রতি অ্যাবাকাস ডেটা’র এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৩৬ শতাংশ কানাডীয় যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের পাল্টা ব্যবস্থাকে সমর্থন করেন।বিবিসি অন্যদিকে লেগার নামে আরেক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে ৫৬ শতাংশ কানাডীয় বলেছেন, ফেডারেল সরকারের উচিত কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ছাড় না দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কে ক্ষুব্ধ কানাডীয়রা ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে শুরু করেছেন। এই বয়কটের কারণে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটন খাতে প্রায় তিন দশমিক তিন বিলিয়ন কানাডীয় ডলার মানে প্রায় আড়াই বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব কমেছে। কানাডার অধিকাংশ প্রদেশের দোকান থেকে মার্কিন মদ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও ওই শিল্পে বড় ধরনের আঘাত করেছে। মার্কিন সরকারের বাণিজ্য তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইন রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৭৮ শতাংশ কমেছে, যার ফলে রপ্তানি আয় প্রায় ৩৫৭ মিলিয়ন ডলার কমেছে। বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন যুক্তরাষ্ট্রের ডিসটিলড স্পিরিটস কাউন্সিলও একই ধরনের তথ্য দিয়েছে। তাদের মতে, প্রাদেশিক নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন স্পিরিটসের রপ্তানি ৭০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। এই নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য হতাশার একটি বড় কারণ হয়ে ওঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধে কানাডার যেসব প্রদেশ তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত তাদেরকেও এখন মি. কার্নির বোঝাতে হবে যে, আলোচনার টেবিল থেকে সরে দাঁড়ানো এবং এর ঝুঁকি নেওয়া প্রয়োজনীয় ছিল। শনিবার তিনি দেশটির প্রাদেশিক নেতাদের বর্তমান পরিস্থিতি অবহিত করেন এবং আপাতত তারাও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান দেখাচ্ছেন। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড ইবি বলেছেন, “যে জাতীয় প্রকল্পে এগিয়ে চলেছি তার প্রতি আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ”। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড বলেন, “আমরা এ লড়াই শুরু করিনি, কিন্তু আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি যে আমরাই এ লড়াইয়ে জিতব”। কী ভুল হয়েছিল?এক সপ্তাহ ধরে মনে হচ্ছিল, ওয়াশিংটন ও অটোয়ার মধ্যে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেছে। ঠিক কীভাবে শেষ মুহূর্তে আলোচনা ভেঙে পড়ল, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে সব পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। মি. কার্নি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শেষ মুহূর্তের প্রস্তাবিত শর্তগুলো ছিল ‘অন্যায্য, অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক এবং এমন যে কোনো চুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে’। শনিবার তিনি আরও বলেন, এসব শর্তের মধ্যে গাড়ি শিল্প নিয়ে দাবি এবং অন্য দেশের সঙ্গে কানাডার বাণিজ্য চুক্তির ওপর অগ্রহণযোগ্য বিধিনিষেধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্যদিকে, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জামিসন গ্রিয়ার অভিযোগ করেছেন, কানাডা নতুন দাবি করেছে এবং আগে দেওয়া কিছু প্রতিশ্রুতি থেকে পিছিয়ে গেছে। শুক্রবার এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ডিসটিলড স্পিরিটস কাউন্সিল বলেছে, কানাডার প্রদেশগুলো মার্কিন স্পিরিটস পণ্য দোকানে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া কানাডীয় গণমাধ্যমে এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে যে, মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক এ চুক্তিতে অসন্তুষ্ট ছিলেন। এ বিষয়ে বিবিসি তার দপ্তরের মন্তব্য জানতে চেয়েছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তির বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ পেতে থাকলে কয়েকজন প্রাদেশিক নেতা, শিল্প সংগঠন এবং রাজনৈতিক বিরোধীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী কার্নি যে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছেন। তবে, কার্নি অস্বীকার করেছেন যে, এসব সমালোচনা তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরব কানাডীয় রাজনীতিবিদদের একজন ডগ ফোর্ড পুরো সপ্তাহে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে নীরব ছিলেন। কিন্তু কার্নিকে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “চাপের মুখে করা কোনো চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে একের পর এক ছাড় আদায়ের জন্য আরও উৎসাহিত করবে”। অন্টারিওর বড় ধরনের উৎপাদন ও গাড়ি শিল্প রয়েছে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বিরোধে প্রদেশটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর একটি। কনজারভেটিভ বিরোধীদলীয় নেতা পিয়েরে পয়লিয়েভরও বলেছেন, কানাডার শিল্পের ওপর ‘একতরফা’ শুল্ক থাকলে সেটি ‘একটি খারাপ চুক্তি’ হবে। শনিবার তিনি আপাতত কার্নির আলোচনার টেবিল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেন, “কানাডা এমন একতরফা শুল্ক মেনে নিতে পারে না, যা আমাদের দেশের শিল্পভিত্তিকে ধ্বংস করে দেবে”। এ চুক্তি ভেঙ্গে পড়া যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ভবিষ্যৎ বাণিজ্য আলোচনার ওপরও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির চলমান পর্যালোচনাও। এখন কার্নি এবং পুরো কানাডাকে অপেক্ষা করতে হবে, মি. ট্রাম্প কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানান তা দেখার জন্য। Post Views: 4 Post navigation হাতীবান্ধা উপজেলা ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা, আহ্বায়ক রাজিব সদস্যসচিব জাহিদ