ফ্যামিলি কার্ডের জনবল নিয়োগ ও মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন-খাদেমের তালিকা নিয়ে মুখোমুখি দুই দল
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বিশেষ প্রতিনিধি:
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে সরকারি ফ্যামিলি কার্ডের জরিপকাজে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ এবং বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের তালিকা প্রণয়নকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়িয়েছে। এসব বিষয়কে ঘিরে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মোরেলগঞ্জ উপজেলা ও পৌর শাখা।
এক পক্ষ নিয়োগে দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ তুলেছে। অন্য পক্ষ এসব অভিযোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর দাবি করে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে।
ফলে ফ্যামিলি কার্ডের মতো একটি জনকল্যাণমূলক সরকারি কর্মসূচির স্থানীয় পর্যায়ের জনবল নিয়োগকে ঘিরে দুই রাজনৈতিক দলের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে মোরেলগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জামায়াতের সংবাদ সম্মেলনে নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগ
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাত সাড়ে ৯টার দিকে মোরেলগঞ্জ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মোরেলগঞ্জ উপজেলা ও পৌর শাখা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা শাহাদাত হোসাইন। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর মাস্টার মনিরুজ্জামান। এ সময় উপজেলা ও পৌর জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মিরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত নেতারা অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ডের জরিপকাজে ইউনিয়নভিত্তিক সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক দলীয়করণ করা হয়েছে।
তাদের দাবি, যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়ে জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বিরোধী মতের প্রার্থীদের যথাযথ সুযোগ না দিয়ে দলীয় ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগও তোলেন জামায়াত নেতারা। এমনকি আওয়ামী লীগের সাবেক রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত পরিবারের সদস্যদেরও নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
জামায়াত নেতাদের আরও অভিযোগ, নিয়োগের দিন বিরোধী মতাদর্শের কয়েকজন প্রার্থীকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ না নিতে হুমকি-ধমকি ও গালিগালাজ করা হয়েছে। পরবর্তীতে প্রকাশিত ফলাফলে দলীয় কর্মিদের নিয়োগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
তারা বলেন, সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কর্মসূচির জনবল নিয়োগে যদি রাজনৈতিক প্রভাব ও পক্ষপাতিত্ব থাকে, তাহলে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পৌঁছানো নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হবে।
এ কারণে তারা বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল করে নতুন করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানান।
ইমাম-মুয়াজ্জিন-খাদেমের তালিকা নিয়েও অভিযোগ
ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগের পাশাপাশি ইউনিয়নভিত্তিক বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের তালিকা প্রণয়ন নিয়েও অভিযোগ তোলে জামায়াত।
তাদের দাবি, সরকারি সহায়তা বা ভাতা প্রদানের উদ্দেশ্যে করা এ তালিকা প্রণয়নেও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে।
জামায়াত নেতারা মেধা, যোগ্যতা ও উপযুক্ততার ভিত্তিতে প্রকৃত যোগ্য ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের তালিকাভুক্ত করার দাবি জানান।
পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জবাব
জামায়াতের সংবাদ সম্মেলনের একদিন পর মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পাল্টা সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে মোরেলগঞ্জ উপজেলা ও পৌর বিএনপি।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহিদুল হক বাবুল, পৌর বিএনপির সভাপতি সিকদার ফরিদুল ইসলাম ও সহ-সভাপতি ফারুক হোসেন সামাদ। এ সময় বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মি উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি নেতারা জামায়াতের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ তোলা হয়েছে।
তাদের দাবি, ফ্যামিলি কার্ডের জরিপ একটি সরকারি কর্মসূচি। এ কর্মসূচির জন্য জনবল নিয়োগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নীতিমালা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা। তাই কোনো রাজনৈতিক দলের পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে—এমন অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা অনভিপ্রেত।
‘যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা’
বিএনপি নেতারা বলেন, কোনো প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় নয়—শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করেছে কি না, সেটিই নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত।
তারা আরও বলেন, জামায়াতের সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থক হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়ার যে অভিযোগ করা হয়েছে, সেটি একই সঙ্গে অস্পষ্ট ও পরস্পরবিরোধী। কারণ বিভিন্ন ইউনিয়নে জামায়াত-শিবিরের কর্মিরাও নিয়োগ পেয়েছেন বলে দাবি করেন তারা।
নিয়োগের দিন প্রার্থীদের হুমকি ও গালিগালাজের অভিযোগ প্রসঙ্গে বিএনপি নেতারা বলেন, এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা প্রয়োজন। প্রমাণ ছাড়া রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তারা।
মসজিদের তালিকা নিয়েও বিএনপির বক্তব্য
ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের সরকারি সহায়তা বা ভাতা প্রদানের তালিকা নিয়েও দলীয়করণের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করে বিএনপি।
তারা বলেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সরকারি সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে সুবিধা দেয়া বা বঞ্চিত করা উচিত নয়।
বিএনপি নেতারা দাবি করেন, সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও যোগ্যতার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। ফ্যামিলি কার্ডসহ সব সরকারি কর্মসূচিতে প্রকৃত উপকারভোগী ও যোগ্য ব্যক্তিরা যেন কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই সুযোগ পান, সেটিই তাদের প্রত্যাশা।
অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে প্রশ্নের মুখে স্বচ্ছতা
মোরেলগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ডের জরিপকাজের জনবল নিয়োগ নিয়ে দুই দলের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে এখন স্থানীয়ভাবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ছিল?
একদিকে জামায়াত অভিযোগ করেছে রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয়করণ ও অনিয়মের; অন্যদিকে বিএনপি এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে প্রকৃত সত্য উদঘাটনে নিয়োগ প্রক্রিয়ার নীতিমালা, প্রার্থীদের যোগ্যতা, বাছাইয়ের মানদণ্ড এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের দাবি সামনে এসেছে।
বিশেষ করে সরকারি কর্মসূচির সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি স্বার্থ জড়িত থাকায় নিয়োগ ও তালিকা প্রণয়নে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি কিংবা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ যেন তৈরি না হয়—এমন প্রত্যাশা স্থানীয় সচেতন মহলের।
প্রমাণভিত্তিক তদন্তের দাবি
দুই দলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে অভিযোগের সত্যতা যাচাই। রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে নিয়োগ প্রক্রিয়ার নথি, আবেদনকারীদের যোগ্যতা, বাছাই কমিটির সিদ্ধান্ত এবং চূড়ান্ত তালিকা যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
বিএনপি সংবাদ সম্মেলন থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়োগ ও তালিকা প্রণয়ন প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা প্রমাণহীন অভিযোগের মাধ্যমে মোরেলগঞ্জের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ অস্থিতিশীল না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াত তাদের অভিযোগের পুনর্বিবেচনা করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে নতুন নিয়োগের দাবি জানিয়েছে।
সরকারি কর্মসূচিতে রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, প্রয়োজন আস্থার পরিবেশ
ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচির মূল লক্ষ্য সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা। তাই এ ধরনের কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে রাজনৈতিক বিরোধ বা পারস্পরিক অভিযোগ যেন সাধারণ মানুষের প্রাপ্য অধিকারকে বাধাগ্রস্ত না করে—এটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করে, তাহলে বিতর্কের অবসান ঘটানো সম্ভব।
কারণ সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, তার প্রকৃত প্রয়োজন ও যোগ্যতাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা। মোরেলগঞ্জের মানুষও প্রত্যাশা করছেন—ফ্যামিলি কার্ডসহ সব সরকারি কর্মসূচি দল-মত-নির্বিশেষে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাবে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *