বিজ্ঞানীরা একটি নির্দিষ্ট জিনকে চিহ্নিত করেন— এসআরজিএপি২। এই জিন শুধু মানুষের শরীরেই পাওয়া যায়। কী ভাবে এরা প্রভাব ফেলে মস্তিষ্কের ক্ষমতার বিকাশে?

নিউটার্ন ডেস্ক :

মানব শরীরে সব মিলিয়ে প্রায় ২০-২৫ হাজার জিন রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই মিলে যায় বানর, শিম্পাঞ্জি বা অন্য স্তন্যপায়ীর সঙ্গে। কোনও ক্ষেত্রে হুবহু, কোনও ক্ষেত্রে সামান্য বদল থাকে। খুব অল্প সংখ্যক জিনই রয়েছে, যা শুধু মানবদেহেই পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা অনুমান, এমনই একটি জিন মস্তিষ্কের ক্ষমতার বিকাশকে প্রভাবিত করে। সেই জিনটিকে চিহ্নিতও করেছেন তারা।আনন্দবাজার ডট কম

আমাদের মস্তিষ্কে মূলত দু’ধরনের কোষ থাকে— নিউরন (স্নায়ু কোষ) এবং গ্লিয়াল কোষ (সহায়ক কোষ)। এর মধ্যে বিশেষ এক ধরনের গ্লিয়াল কোষ ‘মাইক্রোগ্লিয়া’ মস্তিষ্কে রোগ প্রতিরোধক কোষ হিসেবে কাজ করে। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশেও সাহায্য করে। এই কোষ অন্য স্তন্যপায়ীর মস্তিষ্কেও পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ইঁদুরের ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মাইক্রোগ্লিয়া পরিণত হয়ে যায়। সেই কোষই মানব মস্তিষ্কে পরিণত হতে সময় লেগে যায় চার থেকে আট বছর।

অন্য প্রাণীর চেয়ে মানব মস্তিষ্কের বিকাশে বেশি সময় লাগে। এই দীর্ঘ সময়কালই মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষমতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে মনে করা হয়। মানুষের নিউরন যে অন্য প্রাণীর তুলনায় ধীরে পরিণত হয়, তা আগেই জানা ছিল বিজ্ঞানীদের। এ বার জানা গেল মাইক্রোগ্লিয়াও অন্য প্রাণীর তুলনায় অনেক বেশি সময় নেয় পরিণত হতে।

কলম্বিয়ার জুকারম্যান ইনস্টিটিউটের গবেষকরা প্রথম বার এটি আবিষ্কার করেছেন। তাঁদের এই গবেষণাটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘নিউরন’ জার্নালে। গবেষকদলের প্রধান কার্লোস দিয়াজ়-সালাজ়ার কলম্বিয়ার স্নায়ুবিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক পোলিউক্সের গবেষণাগারে কাজ করার সময়ে এটি আবিষ্কার করেন। তার কথায়, “মানবদেহের মাইক্রোগ্লিয়া এই ধীর গতিতে পরিণত হওয়ার ফলে মস্তিষ্ককে এমন ভাবে প্রভাবিত করে, যা মস্তিষ্কের ক্ষমতাকে সক্রিয় করে তোলে।”

এই গবেষণার সময়ে বিজ্ঞানীরা একটি নির্দিষ্ট জিনকে চিহ্নিত করেন— এসআরজিএপি২। এই জিন শুধু মানবদেহেই পাওয়া যায়। এটি কী ভাবে মানব মস্তিষ্ককে অন্য প্রাণীর থেকে আলাদা করে তোলে, তা নিয়ে আগে থেকেই গবেষণা চলছিল। অতীতে গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই জিন নিউরনের সিন্যাপ্স (দু’টি নিউরনের সংযোগস্থল, যার মাধ্যমে একটি নিউরন থেকে অন্য নিউরনে স্নায়বিক উদ্দীপনা পৌঁছোয়)-এর সংখ্যা বৃদ্ধি করে। একই সঙ্গে সিন্যাপ্সগুলিকে খুব ধীর গতিতে পরিণত হতেও সাহায্য করে।

নতুন গবেষণায় দেখা গেল, এই জিন শুধু নিউরনে নয়, মাইক্রোগ্লিয়াতেও রয়েছে। তা-ও নিউরনের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ। এখান থেকেই প্রথম খটকা জাগে বিজ্ঞানীদের মনে— মাইক্রোগ্লিয়ায় কেন এতটা সক্রিয় এই জিন? সেই সূত্র ধরে আরও এগোয় গবেষণা।

মানবদেহের মস্তিষ্কে মোট যত কোষ রয়েছে, তার ৫-১০ শতাংশই মাইক্রোগ্লিয়া। এই কোষগুলি যে মস্তিষ্কের সংক্রমণ ঠেকানোর পাশাপাশি মস্তিষ্কের বিকাশেও সাহায্য করে। মস্তিষ্কের বিকাশের সময়ে কোন নিউরনগুলি থাকবে এবং কোনগুলি ধ্বংস হবে— তা প্রভাবিত করে এই কোষগুলি।

ব্রহ্মাণ্ডের ৯৫ শতাংশই অদৃশ্য! ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জির রহস্যসন্ধানে মহাকাশে নতুন টেলিস্কোপ পাঠাচ্ছে নাসা
গবেষকেরা মানবদেহের মাইক্রোগ্লিয়া (যেখানে এসআরজিএপি২ জিন রয়েছে) এবং ইঁদুর মাইক্রোগ্লিয়া কোষের উপরে গবেষণাটি চালান। তাতে দেখা যায়, এসআরজিএপি২ জিনগুলি মাইক্রোগ্লিয়ার পরিণত হওয়াকে উল্লেখযোগ্য ভাবে শ্লথ করে দেয়। মানবদেহের মাইক্রোগ্লিয়ার পরিণত হতে চার থেকে আট বছর সময় লেগে যায়। ইঁদুরের ক্ষেত্রে তা তিন সপ্তাহের মধ্যেই পরিণত হয়ে যায়।

গবেষকদলের প্রধান সালাজ়ারের কথায়, “এই জিনটি নিউরনের বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে। একই সঙ্গে মাইক্রোগ্লিয়ার বিকাশকে নিয়ন্ত্রণের জন্যও প্রকৃতি একে বেছে নিয়েছে।” গবেষণায় আভাস মিলেছে, নিউরন এবং মাইক্রোগ্লিয়ার পাশাপাশি অন্য মস্তিষ্ক কোষকেও ধীর গতিতে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে এই জিনটি। তবে এটি কী ভাবে এই কোষগুলিকে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে আরও গবেষণার দরকার রয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *