আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
বিয়ের দুই বছর পরও সন্তান না হওয়ায় চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন দিল্লির বছর ২৬-এর একজন যুবক। এরপর শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময়ে চিকিৎসকরা লক্ষ্য করেন তার শরীরের ভেতরে গর্ভাশয় ও ফ্যালোপিয়ান টিউব দুই-ই উপস্থিত রয়েছে।

যে ডাক্তার ওই ব্যক্তির চিকিৎসা করছিলেন, তিনি জানিয়েছেন বাহ্যিকভাবে আর পাঁচজন পুরুষের মতোই ওই ব্যক্তির শারীরিক গঠন। তার শারীরিক বৈশিষ্ট্যও পুরুষেরই মতো। তাছাড়া এমন কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ ছিল না যার উপর ভিত্তি করে কেউ আন্দাজ করতে পারে যে ওই পুরুষের শরীরে গর্ভাশয় এবং ফ্যালোপিয়ান টিউব রয়েছে।বিবিসি

ঘটনাটা দিল্লির এক বেসরকারি হাসপাতালের। সেখানকার চিফ ইউরোলজিস্ট ডা. সুশীল খারবান্দার জানিয়েছেন বন্ধ্যাত্ব পরীক্ষার সময়ে দেখা যায় যে ওই ব্যক্তির শরীরে উপস্থিত রয়েছে জরায়ু এবং ফ্যালোপিয়ান টিউব।

চিকিৎসকদের মতে, এই অবস্থা খুবই বিরল। একে ‘পারসিসেন্ট মুলেরিয়ান ডাক্ট সিন্ড্রোম’ (পিএমডিএস) বলা হয়। এই অবস্থা জন্মগত। গোটা বিশ্বে এখনো পর্যন্ত ৩০০-রও কম পিএমডিএস- এর কেস নথিভুক্ত হয়েছে।

নেচার রিভিউ ইউরোলজিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে, পিএমডিএস রয়েছে এমন ব্যক্তি পুরুষ ক্রোমোজোম (৪৬XY) নিয়ে জন্মান এবং তাদের শরীর পুরুষের দেহের মতোই বিকাশ লাভ করে। তবে মুলেরিয়ান নালী দ্বারা গঠিত অঙ্গ যেমন জরায়ু এবং ফ্যালোপিয়ান টিউব তাদের শরীরে উপস্থিত থাকে।

মুলেরিয়ান নালী আসলে একজোড়া ভ্রূণীয় কাঠামো যা বিকশিত হয়ে নারী দেহের অভ্যন্তরীণ প্রজনন অঙ্গ গঠন করে।

জানুয়ারি ২০২৬ সালে ‘গ্লোবাল জার্নাল অফ সার্জারি অ্যান্ড কেস রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ৪৮ বছরের এক ব্যক্তি বারবার প্রস্রাব পাওয়া এবং বীর্যে রক্তপাতের সমস্যায় ভুগছিলেন।

পরীক্ষার সময়ে তার দেহে জরায়ুর মতো একটা অংশ দেখা যায়। অস্ত্রোপচারের সময়ে, প্রোস্টেটের সঙ্গে যুক্ত দুই অংশ বিশিষ্ট এই অংশটি অপসারণ করা হয়।

হিস্টোপ্যাথলজিকাল পরীক্ষায়, ওই অংশটিকে জরায়ু টিস্যু হিসেবে নিশ্চিত করা হয়। যদিও ওই ব্যক্তির শারীরিক বিকাশও আর পাঁচজন পুরুষের মতোই ছিল।

ঠিক একইভাবে, ২০১৯ সালের একটা রিপোর্টে বছর দেড়েকের এক বালকের শরীরে জরায়ু, ফ্যালোপিয়ান টিউব এবং ডিম্বাশয়ের মতো কাঠামোর উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো জরায়ু এবং ফ্যালোপিয়ান টিউব কীভাবে পুরুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্যযুক্ত ব্যক্তির দেহে উপস্থিত থাকতে পারে? কেন এমনটা ঘটে এবং তা কীভাবে সনাক্ত করা হয়?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে চিকিৎসক ডা. সুশীল খারবান্দার সঙ্গে কথা বলেছি আমরা। দিল্লির ওই ব্যক্তির চিকিৎসা করেছেন এই বিশেষজ্ঞ।

চিকিৎসার ভাষায় বিষয়টাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়- তা ডা. সুশীল খারবান্দার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেছেন, “২৬ বছরের ওই ব্যক্তি দু’বছর আগে বিয়ে করেছিলেন। তিনি যৌনভাবে সম্পূর্ণরূপে সক্রিয় ছিলেন এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে যে সমস্ত সেকেন্ডারি (গৌণ) যৌন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, তা-ও তার ক্ষেত্রে উপস্থিত ছিল।”

“বন্ধ্যাত্বের সমস্যার বিষয়ে পরীক্ষা করার সময় দেখা যায়, তার দুটো অণ্ডকোষ স্বাভাবিক অবস্থানে নেই।”

পুরুষের গৌণ যৌন বৈশিষ্ট্য বলতে বোঝায় সেই সমস্ত শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে বোঝায় যা বয়ঃসন্ধিকালে দেখা যায়। এটা পুরুষ ও নারীর মধ্যে পার্থক্য গড়ে তোলে।

ডা. সুশীল খারবান্দা ব্যাখ্যা করেছেন, “অন্যান্য পুরুষদের মতোই ওই ব্যক্তির দেহে টেস্টোস্টেরন, এফএসএইচ (ফলিকল-স্টিমুলেটিং হরমোন) এবং এলএইচ (লুটিনাইজিং হরমোন) স্বাভাবিক ছিল।”

এখন, ফলিকল-স্টিমুলেটিং হরমোন হলো মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে তৈরি হওয়া এমন এক রাসায়নিক বার্তাবাহক যা যৌন বিকাশ, প্রজনন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। লুটিনাইজিং হরমোনও পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন হয়। এই রাসায়নিক বার্তাবাহক পুরুষ ও নারী উভয়ের যৌন বিকাশ, প্রজনন এবং কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে।

ডা. সুশীল খারবান্দার কথায়, “এই জাতীয় বিষয় ক্রিপ্টোরকিডিজম বা অপ্রকাশিত টেস্টিসযুক্ত রোগীদের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে।”

“(ওই ব্যক্তির) এমআরআই চলাকালীন, একটা অস্বাভাবিক অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। পরীক্ষায় দেখা যায়, জরায়ু ও ফ্যালোপিয়ান টিউবগুলো অণ্ডকোষের সাথে যুক্ত ছিল।”

পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন, “এই অঙ্গগুলো ভেতর থেকে সম্পূর্ণরূপে বিকশিত ছিল, ঠিক যেমনটা সাধারণত একজন নারীর শরীরে দেখা যায়।”

পুরুষের শরীরে জরায়ু ও ফ্যালোপিয়ান টিউব কীভাবে ?
ডা. খারবান্দা বলেছেন, “শিশু যখন মাতৃগর্ভে থাকে, তখন ক্রোমোজোম এবং হরমোনের প্রভাবে তার লিঙ্গ নির্ধারিত হয়। পুরুষদের সাধারণত ৪৬XY ক্রোমোজোম এবং নারী দেহে ৪৬XX ক্রোমোজোম থাকে।”

এই সময়ে শরীরে অ্যান্টি-মুলেরিয়ান হরমোন তৈরি হয়। অ্যান্টি-মুলেরিয়ান হরমোন মুলেরিয়ান নালীগুলোকে নারী দেহে উপস্থিত অভ্যন্তরীণ অঙ্গে (যেমন জরায়ু) পরিণত হতে বাধা দেয়।

ওই বিশেষজ্ঞের কথায়, “যদি কারো দেহে ৪৬XY ক্রোমোজোম থাকে, তাহলে তিনি পুরুষ হিসেবে বেড়ে ওঠেন এবং তার শরীর অ্যান্টি-মুলারিয়ান হরমোন তৈরি করে।

এটা জরায়ু এবং ফ্যালোপিয়ান টিউবের মতো অঙ্গের বিকাশকে বাধা দেয়।”

“কিন্তু পারসিসেন্ট মুলেরিয়ান ডাক্ট সিন্ড্রোম-এর ক্ষেত্রে এই হরমোন হয় অনুপস্থিত থাকে অথবা তার রিসেপ্টরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে জরায়ু এবং ফ্যালোপিয়ান টিউবের মতো অঙ্গগুলো শরীরের ভেতরেই থেকে যায়।”

“এর ফলে সেই ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গঠন ভিন্ন হয়। দেহের বাহ্যিক শারীরিক গঠন অবশ্য পুরুষের মতোই থাকে। পুরুষের যৌনাঙ্গ এবং অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য স্বাভাবিকভাবেই বিকশিত হয়,” বলেছেন ডা. খারবান্দা।

এই রোগীর অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয়- দুই ছিল কি?
ডা. সুশীল খারবান্দা ব্যখ্যা করেছেন, “এই রোগীর দেহে দু’পাশে জরায়ু ও ফ্যালোপিয়ান টিউব থাকলেও ডিম্বাশয় ছিল না। ডিম্বাশয়ের পরিবর্তে তার শরীরে অণ্ডকোষ ছিল।”

“এগুলো জননাঙ্গ, যা পুরুষ এবং নারীর ক্ষেত্রে ভিন্ন। এই রোগীর দেহে দুটো জননাঙ্গই অণ্ডকোষ, ডিম্বাশয় নয়।”

স্ক্যান করলে আগে ধরা পড়ত?
এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, “রোগী আমাদের কাছে এসেছিলেন, তখন তার উভয় অণ্ডকোষই আনডিসেন্ডেড অবস্থায় ছিল, যার অর্থ হলো সেগুলো নিজেদের সঠিক অবস্থানে ছিল না। হরমোন পরীক্ষার পাশাপাশি তার বীর্যে অ্যাজুস্পার্মিয়া অর্থাৎ স্পার্ম কাউন্ট (শুক্রাণু গণনা) শূন্য পাওয়া গিয়েছিল।”

“এরপর এমআরআই করা হয়। এতে জরায়ু, ফ্যালোপিয়ান টিউব এবং তাদের সাথে সংযুক্ত অণ্ডকোষ দেখা গিয়েছিল।”

এরপর তার ক্রোমোজোম পরীক্ষা করা হয়।

“এর পরে ক্রোমোসোমাল বিশ্লেষণ করা হয়েছিল, সেখানে ৪৬XY ক্রোমোজোম পাওয়া গিয়েছিল। এমআরআই এবং ক্রোমোসোমাল বিশ্লেষণ এই বিষয়টা নিশ্চিত করার জন্য এটাই প্রধান পরীক্ষা পদ্ধতি ছিল,” বলেছেন ডা. সুশীল খারবান্দা।

তবে তিনি জানিয়েছেন এই বিষয়টা স্ক্যানের সাহায্যে নিশ্চিত করা সম্ভব।

তার কথায়, “এমন নয় যে এই অবস্থা ২৬ বছর বয়স অবধি সনাক্ত করা সম্ভব ছিল না, সময়মতো স্ক্যান করা হলে এই অবস্থা আগে থেকেই ধরা পড়ত।”

“এই রোগী প্রাথমিকভাবে খেয়াল করেননি যে তার দুই অণ্ডকোষই নিজেদের স্বাভাবিক অবস্থানে নেই।”

এর লক্ষণ কী?
এই সমস্ত ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণ থাকে কি না তা জানতে চাওয়া হয়েছিল ডা. সুশীল খারবান্দার কাছে।

উত্তরে তিনি বলেছেন, “ব্যথা, বমি বা জ্বরের মতো কোনো নির্দিষ্ট লক্ষণ এক্ষেত্রে থাকে না। এর একটা লক্ষণ হতে পারে যে অণ্ডকোষগুলো তাদের স্বাভাবিক জায়গায় নেই।”

জীবনে পরিবর্তন কী আনতে পারে?
এই সমস্ত ক্ষেত্রে শারীরিক পরিবর্তন বা মানসিক চাপ দেখা দেয়ার প্রসঙ্গে ডা. খারবান্দা বলেছেন, “বছর ২৬-এর এই ব্যক্তি যখন জানতে পারেন তার দেহে নারীদের জননাঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কিত অঙ্গ রয়েছে তখন তিনি বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং মানসিক চাপে পড়ে যান। তার ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তিত ছিলেন তিনি।”

“আমরা তাকে দীর্ঘ সময় ধরে বুঝিয়েছি এবং ব্যাখ্যা করেছি যে এটা একটা বিরল মেডিকেল স্টেট। তবে এটা বিরল হলেও এমন নয় যে সেটা তার জীবনে কোনো বড় পরিবর্তন আনবে।”

“এই অঙ্গগুলো অপসারণ করা দরকার ছিল, কারণ তা ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই অঙ্গ অপসারণ করার পর তিনি এখন স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন।”

সবসময় সার্জারি বা চিকিৎসার প্রয়োজন হয়?
“এই রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন ছিল। জরায়ু এবং ফ্যালোপিয়ান টিউবগুলো অনুন্নত ছিল এবং শরীরে তাদের কোনো কাজ ছিল না।”

“অস্ত্রোপচারের পরে একটা বায়োপসিতে একটা অণ্ডকোষে প্রাক-ক্যান্সারের অবস্থা লক্ষ্য করা গিয়েছিল,” ব্যাখ্যা করেছেন ডা. সুশীল খারবান্দা।

অস্ত্রোপচারের পর প্রভাব
ডা. সুশীল খারবান্দা বলেছেন, “অস্ত্রোপচারের সাত দিন পর রোগী নিজের কাজে যোগ দিয়েছেন। যেহেতু অণ্ডকোষ টেস্টোস্টেরন তৈরি করে, তাই সেগুলো অপসারণ করার পরে শরীর টেস্টোস্টেরন উৎপাদন করবে না। অতএব, তাকে প্রতি তিন মাস অন্তর টেস্টোস্টেরন ইনজেকশন নিতে হবে।”

“এ ছাড়া তার যৌন বা সামাজিক জীবনে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে না।”

“আমরা ল্যাপারোস্কোপিক্যালি অর্থাৎ টেলিস্কোপের সাহায্যে অস্ত্রোপচার করেছি। এর জন্য কোনও বড় ছিদ্রের প্রয়োজন হয়নি এবং তিনি দ্রুত কাজে ফিরে আসতে সক্ষম হন।”

যে সমস্ত ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নানা প্রশ্ন রয়েছে, কিছু ভ্রান্ত ধারণাও আছে।

সুশীল খারবান্দা বলছিলেন, “এই সব ক্ষেত্রে রোগী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়তে পারেন কি না, তার পিরিয়ড হয়েছে কি না বা বাইরে থেকে তাকে নারীর মতো দেখতে লাগে কি না এমন অনেক প্রশ্ন ওঠে।”

“তবে এর কোনোটাই সত্যি নয়। জরায়ু এবং ফ্যালোপিয়ান টিউব তার শরীরে উপস্থিত ছিল, তবে সেগুলো অনুন্নত ছিল। গর্ভাবস্থা সম্ভব ছিল নয়। তার শরীরে নারীদের হরমোন-জনিত বিষয়ও লক্ষ্য করা যায়নি।”

কী শিক্ষণীয়?
এই নির্দিষ্ট ঘটনা থেকে কী শেখার রয়েছে এই প্রশ্নের উত্তরে ডা. সুশীল খারবান্দা বলেছেন, “এটা থেকে আমরা যা শিখতে পারি তা হলো শরীরে যেকোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলে তা উপেক্ষা করা যাবে না বা লজ্জাও পাওয়া যাবে না।

“এই অবস্থায় সময়মতো একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। যদি নবজাতক শিশুর কোনও অস্বাভাবিক গঠন বা কোনও অঙ্গের অনুপস্থিতি চোখে পড়লে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত, কারণ সময়মতো সনাক্ত করা গেলে তা চিকিৎসার ক্ষেত্রে সাহায্য করবে।”
Article Information
Author,সুমনদীপ কৌর
Role,বিবিসি নিউজ পাঞ্জাবী, দিল্লি

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *