নর্থ ক্যারোলিনার যে হোটেলটি গবেষণার জন্য ব্যবহার করা হয়, সেটি বাইরে থেকে আর পাঁচটা সাধারণ হোটেলের ঘরের মতোই। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলেই যেন এক অন্য পরিবেশ। আন্তর্জাতিক ডেস্ক : গবেষণাগার কি এমনও হয়! আমেরিকার এক হোটেলের একটি সাধারণ ঘর। ভাড়া ৮০ ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ৭৫০০ টাকার কিছু বেশি)। হোটেলের সেই ঘরকেই বদলে দেয়া হয় আস্ত এক অস্থায়ী গবেষণাগারে। প্রথাগত ধারণার বাইরে স্বল্প খরচের এই গবেষণায় আবিষ্কার হয়েছে এককোষী অ্যামিবা পলিনেল্লার দুই নতুন প্রজাতি। আনন্দবাজার ডট কম গবেষণার প্রাথমিক সূত্রপাত ২০২১ সালে, অর্থাৎ ট্রাম্প দ্বিতীয় বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগেই। পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সরকারি অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তার আবহে গবেষণাটির পরবর্তী পর্যায়ের কাজ স্বল্প খরচের অস্থায়ী ল্যাবেই চালানো হয়। স্বল্প খরচের গবেষণায় এমন সাফল্যে বিশ্ব জুড়ে বিজ্ঞানীমহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। নর্থ ক্যারোলিনার বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী জুলিয়া ভ্যান এটেন পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাচ্ছিলেন আউটার ব্যাঙ্কসে। সেখানে রাস্তার ধারের জলাশয় থেকে তিনি নমুনা সংগ্রহ করেন। সেই নমুনা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে শখের অণুবীক্ষণ যন্ত্রে (তুলনামূলক কম দামি) পরীক্ষা করে দেখেন জুলিয়া। পলিনেল্লার উপস্থিতি তখনও ধরা পড়ে। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালে আরও বিশদে গবেষণার সময়ে আরও নমুনা সংগ্রহ করা হয়। গবেষণার জন্য ভাড়া নেয়া হয় হোটেলের ঘর। তাতে উঠে আসে— ওই নমুনায় রয়েছে সম্পূর্ণ নতুন দুই প্রজাতির পলিনেল্লা। জুলিয়া এবং তার সহযোগীরা দুই প্রজাতির নাম দেন— পলিনেল্লা মারাই এবং পলিনেল্লা মুরাই। গত মাসে ‘জার্নাল অফ ফাইকোলজি’তে তাদের এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। নর্থ ক্যারোলিনার যে হোটেলটিকে তারা গবেষণার জন্য ব্যবহার করেন, সেটি বাইরে থেকে আর পাঁচটা সাধারণ হোটেলের ঘরের মতোই। কিন্তু দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলেই যেন এক অন্য পরিবেশ। ঘরের দেয়াল ঘেঁষে সারি সারি জগ। তাতে রাখা নোনা জল (সাধারণত পলিনেল্লা থাকে ঈষৎ লবণাক্ত বা ব্র্যাকিশ জলে)। বালতিতে রাখা আউটার ব্যাঙ্কসের জলাভূমির ঘাস। আর বিছানার পাশের টেবিলগুলি ব্যবহার করা হয় মাইক্রোস্কোপ রাখার স্ট্যান্ড হিসেবে। এই আবিষ্কার শুধু পলিনেল্লার দুই নতুন প্রজাতির সন্ধান পাওয়ার মধ্যেই সীমিত নয়। এর পরিধি আরও বিস্তৃত। এত দিন পর্যন্ত পৃথিবীতে সালোকসংশ্লেষকারী পলিনেল্লার মাত্র চারটি প্রজাতিই আবিষ্কৃত হয়েছিল। এ বার তা বেড়ে হল ছয়। স্থলজ উদ্ভিদ, ফার্ন এবং বহু শৈবালের সালোকসংশ্লেষী অঙ্গাণুর বিবর্তনের পিছনে যে প্রাথমিক অন্তঃসহাবস্থা (প্রাইমারি এন্ডোসিম্বায়োসিস) কাজ করেছিল, তাদের সকলেরই সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার বিবর্তন ঘটেছিল প্রায় ১৬০ কোটি বছর আগের এক ঘটনায়। সে সময়ে এক এককোষী অ্যামিবা থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তবে মাত্র দু’দশক আগে জীববিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন— প্রায় ৯–১৪ কোটি বছর আগে পলিনেল্লার পূর্বপুরুষের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র প্রাথমিক অন্তঃসহাবস্থার ঘটনা ঘটে। একটি সায়ানোব্যাকটেরিয়া ওই কোষের ভিতরে স্থায়ী ভাবে বসতি গড়ে তোলে এবং পরে সালোকসংশ্লেষী ক্রোমাটোফোরে পরিণত হয়। তবে সব পলিনেল্লায় এই সালোকসংশ্লেষের ক্ষমতা দেখা যায় না। তাই সালোকসংশ্লেষকারী পলিনেল্লার জোড়া নতুন প্রজাতির একসঙ্গে সন্ধান পাওয়া জীববিজ্ঞানীদের কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক ভাবে জুলিয়া নিজের বাড়িতে যে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে এই পলিনেল্লাগুলির সন্ধান পান, তা একেবারে সাধারণ মানের যন্ত্র। মাত্র ৩০০ ডলারের (ভারতীয় মুদ্রায় ২৮ হাজার টাকার কিছু বেশি) একটি অণুবীক্ষণ যন্ত্র এবং ১৯৮ ডলারের (প্রায় ১৯ হাজার টাকা) একটি ক্যামেরা দিয়ে গবেষণাটি শুরু করেন তিনি। তাতে এমন দু’টি ক্ষুদ্র কোষ দেখতে পান, যা তিনি আগে কখনও দেখেননি। এক একটি কোষ প্রায় ১৫ মাইক্রোমিটার (এক মিটারের দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগকে এক মাইক্রোমিটার বলে) লম্বা। তখনই তিনি অনুমান করেন, সেগুলি সম্পূর্ণ নতুন কোনও প্রজাতি হতে পারে। তবে তখনও নিশ্চিত ছিলেন না তিনি। ফলে এ নিয়ে আরও বিশদ গবেষণার প্রয়োজন হয় জুলিয়ার। তার অনুমানের বিষয়ে অন্য বিজ্ঞানীদেরও জানান তিনি। তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা চান। শেষে গবেষকদের একটি দল মিলে এ বিষয়ে বিশদ গবেষণা শুরু করেন। গবেষকদলে ছিলেন ডিউক ইউনিভার্সিটির গবেষক অ্যান্ড্রু উইলোবি, বিগেলো ল্যাবরেটরি ফর ওশান সায়েন্সেসের জন বার্ন-সহ আরও বেশ কয়েকজন। নর্থ ক্যারোলিনার ওই হোটেল ঘরে গত কয়েক বছরের গবেষণায় শেষ পর্যন্ত গবেষণায় নিশ্চিত হয়, সেগুলি দু’টি সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতি। Post Views: 29 Post navigation অল-রাউন্ড ব্যবহারের উপযোগী নতুন সি-সিরিজ স্মার্টফোন আনছে রিয়েলমি