নিউটার্ন ডেস্ক :

অ্যান্টার্কটিকার নিকটবর্তী একটি প্রত্যন্ত আগ্নেয় দ্বীপ থেকে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে আকাশপথে করা সমীক্ষায় জানা গেছে।বিবিসি

জাভোডোভস্কি দ্বীপ একসময় বিশ্বে পেঙ্গুইনদের সবচেয়ে বড় ঝাঁকের আবাসস্থল ছিল, কিন্তু জরিপ পরিচালনাকারী গবেষকরা বলছেন যে দ্বীপটি এখন সেই খেতাব হারিয়েছে।

সমীক্ষা অনুসারে, ২০১১ সালের একই সময়ের তুলনায় ২০২৫ সালে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের ব্যবহৃত বাসার সংখ্যা ৬৩ শতাংশ কমে গিয়েছিল।

গবেষক দলটি বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন পাখিদের খাদ্য সরবরাহ ও অস্তিত্বকে প্রভাবিত করছে এবং পেঙ্গুইনরা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

পেঙ্গুইনের আরেকটি প্রজাতি, ম্যাকরনি, এই দ্বীপে বাসা বাঁধে এবং সংখ্যায় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা তাদের আরও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাসকে মনে করেন।

জাভোডোভস্কি দক্ষিণ স্যান্ডউইচ দ্বীপপুঞ্জের একটি অংশ, যা অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের উত্তরে অবস্থিত একটি প্রত্যন্ত দ্বীপপুঞ্জ এবং যুক্তরাজ্যের একটি বৈদেশিক অঞ্চল।

২০১১ সালে, ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভে (বিএএস) এটিকে বিশ্বের বৃহত্তম পেঙ্গুইন কলোনির আবাসস্থল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়—যেখানে আনুমানিক ছয় লাখ চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন এবং ৯০ হাজার ম্যাকরনি পেঙ্গুইন এর রুক্ষ ও পাথুরে ভূখণ্ডে বাসা বাঁধে।

এই নতুন গবেষণার নেতৃত্বদানকারী বিএএস বলেছে, এটি “ক্ষেত্রকর্ম পরিচালনার জন্য বিশ্বের অন্যতম চরম একটি স্থান”।

বিএএস-এর একটি দল ড্রোন, আকাশ থেকে তোলা ছবি এবং ২০টি পাখির শরীরে ট্র্যাকিং ডিভাইস লাগিয়ে দ্বীপটিতে পৌঁছাতে ও এর পক্ষীকুল নিয়ে গবেষণা করতে ১৫ দিন ধরে নৌযাত্রা করে।

এই গবেষণা এবং স্যাটেলাইট চিত্র থেকে জানা যায় যে, ২০১১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের ব্যবহৃত বাসার সংখ্যা ৬৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

পেঙ্গুইনগুলো সব কোথায় গেল?
গবেষকদের মতে, চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের সংখ্যায় এই ‘উদ্বেগজনক’ পতনের মূল কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট খাদ্য সংকট এবং সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি।

গবেষণাটির নেতৃত্বদানকারী অধ্যাপক নরম্যান র‍্যাটক্লিফ ব্যাখ্যা করেছেন যে, চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের ‘বিশেষায়িত খাদ্যতালিকা’ এবং শীতল জলের প্রতি পছন্দের কারণেই তারা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

পানির তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে, চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন যে প্রাণীদের খায়, যেই ক্রিলগুলো দক্ষিণ দিকে সরে গেছে।

“দক্ষিণে সামুদ্রিক বরফের আচ্ছাদন এবং বাসা বাঁধার জন্য উপযুক্ত দ্বীপের অভাব চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনদের খাদ্যের সন্ধানে যেতে বাধা দেয়,” তিনি বলেন।

ক্ষুধার্ত তিমি এবং সক্রিয় আগ্নেয়গিরি
দলটি তাদের এই দুর্গম দ্বীপে পেঙ্গুইনদের নাজুক অস্তিত্বের জন্য অন্যান্য সম্ভাব্য হুমকিগুলোও খতিয়ে দেখেছে। এখানকার পাখিরা একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি—মাউন্ট কারি, যা মাউন্ট অ্যাসফিক্সিয়া নামেও পরিচিত—এর পাদদেশে বাসা বাঁধে।

আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে নির্গত ধোঁয়ার গন্ধের কারণে এর বায়ুপ্রবাহের দিকের স্থানগুলোর নাম দেয়া হয়েছে স্টেঞ্চ পয়েন্ট, নক্সিয়াস ব্লাফ এবং অ্যাসফিক্সিয়া প্লেইন-এর মতো।

ডক্টর র‍্যাটক্লিফ বিবিসি নিউজকে বলেছেন, “এর সাথে যখন পেঙ্গুইনের বিষ্ঠা যোগ হয়, তখন এটি সত্যিই বিশ্বের অন্যতম দুর্গন্ধময় একটি জায়গায় পরিণত হয়।”

এটা পেঙ্গুইনদের জন্য তৈরি মরডর বা বিপজ্জনক রাজ্যের মতো।

মাউন্ট কারির শেষ বড় অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল ২০১৬ সালে, কিন্তু এই গবেষণায় বিশ্লেষণ করা পেঙ্গুইনের সংখ্যা হ্রাস ২০১১ সাল থেকে স্থির ও চলমান ছিল, যা অন্য কিছুর ইঙ্গিত দেয়।

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় ছিল ক্রিলের জন্য চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনদের প্রতিযোগিতা। কারণ পরিযায়ী হাম্পব্যাক তিমিরাও প্রচুর পরিমাণে ক্রিল খায়। যদিও তাদের বিপুল পরিমাণ মল সামুদ্রিক উদ্ভিদের জন্য সার হিসেবে কাজ করে, যে উদ্ভিদগুলো ক্রিলের খাদ্য। ফলে মূলত ক্রিলের উৎপাদন বাড়াতেও সাহায্য করে তিমিরা।

গবেষকদের মতে, সমুদ্রের খাদ্য সরবরাহে জলবায়ু সংক্রান্ত আরও মৌলিক একটি পরিবর্তনই এর জন্য দায়ী।

এই গল্পের একটি অপ্রত্যাশিত দিক রয়েছে যা এই অঞ্চলটি কীভাবে এবং কেন পরিবর্তিত হচ্ছে তার চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তোলে; যেখানে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে, সেখানে দ্বীপটিতে ম্যাকরনি পেঙ্গুইনের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলেন, ম্যাকারনি পেঙ্গুইনরা আরও বেশি অভিযোজনক্ষম, কারণ তাদের খাদ্যতালিকা আরও বিস্তৃত ও নমনীয়।

গবেষণা থেকে প্রাপ্ত পর্যবেক্ষণ তথ্য দেখিয়েছে যে, ম্যাকরনিগুলো দ্বীপটির উত্তর-পূর্ব দিকের উষ্ণতর জলে খাবার খুঁজত, যেখানে বিজ্ঞানীরা বলছেন যে তারা সম্ভবত মাছ এবং অন্যান্য ক্রাস্টেশিয়ান দিয়ে তাদের খাদ্যের ঘাটতি পূরণ করত।

ডক্টর র‍্যাটক্লিফ বলেছেন, এই পরিবর্তনটি ছিল “অ্যান্টার্কটিকার কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে এ পর্যন্ত পরিলক্ষিত জীবগোষ্ঠীর গঠনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন”।

তিনি আরও বলেন, “আমাদের তথ্য থেকে দেখা যায় যে, শীত-সহনশীল অ্যান্টার্কটিক চিনস্ট্র্যাপ প্রজাতিগুলো তাদের উপ-অ্যান্টার্কটিক প্রতিবেশীদের পাশে আর ভালোভাবে টিকে থাকতে পারছে না”।

এটি আরও একটি প্রমাণ যে, অ্যান্টার্কটিকার দ্রুত উষ্ণায়ন কীভাবে অনন্য ও সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করছে।

বিশ্বের বৃহত্তম পেঙ্গুইন কলোনির খেতাবের ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই স্থানটি এখন পাঁচ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরে—অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের অপর প্রান্তে—রস সাগরের কেপ অ্যাডেয়ারের দখলে রয়েছে।

গবেষণাটি ‘কারেন্ট বায়োলজি’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
Article Information
Author,ভিক্টোরিয়া গিল
Role,বিজ্ঞান বিষয়ক সংবাদদাতা

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *