‘সারপ্রাইজ় হানিমুন’, ‘মিস্ট্রিমুন’ নানা ইংরেজি অভিধা পেয়েছে সফরের এই ধারা। আদপে সঙ্গীকে চমকে দিয়ে মধুচন্দ্রিমায় নিয়ে যাওয়ার ট্রেন্ড চলছে এখন বিশ্ব জুড়ে। কেবল স্বামী নয়, এমন ভাবে চমক দিচ্ছেন স্ত্রীরাও। নিউটার্ন ডেস্ক : সদ্য বিয়ে হয়েছে। নতুন সংসার গুছিয়ে উঠতেই নাজেহাল। এমনই এক দিন সন্ধ্যায় স্বামী অনুরোধ করলেন, ১৫ মিনিট দূরে কফিশপে গিয়ে চা-কফি খেয়ে আসার জন্য। আপনিও ঘরের জামার উপর একখানি শ্রাগ চাপিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। পায়ে চপ্পল। অ্যাপ ক্যাব ডাকলেন। কিন্তু সেই যাত্রা ১৫ মিনিটে শেষ হল না। গিয়ে দাঁড়াল ১৫ ঘণ্টায়! কফিশপের বদলে পৌঁছে গেলেন বিমানবন্দরে। সেখান থেকে বিদেশের কোনও এক সমুদ্রসৈকতে বা পাহাড়ি এলাকায় অথবা জমজমাট কোনও শহরে।আনন্দবাজার ডট কম ব্যাপারটা খানিকটা ‘অপহরণ’-এর মতো মনে হতে পারে। কিন্তু এমনই এক নবদম্পতির গল্প ছড়িয়ে পড়েছিল ইনস্টাগ্রামের রিলে রিলে। আদপে এ হল নতুন প্রজন্মের প্রেম-ভ্রমণের ধরন। ‘সারপ্রাইজ় হানিমুন’, ‘মিস্ট্রিমুন’ নানা ইংরেজি অভিধা পেয়েছে সফরের এই ধারা। আদপে সঙ্গীকে চমকে দিয়ে মধুচন্দ্রিমায় নিয়ে যাওয়ার ট্রেন্ড চলছে এখন বিশ্ব জুড়ে। কেবল স্বামী নয়, এমন ভাবে চমক দিচ্ছেন স্ত্রীরাও। এখন অনেক নবদম্পতির মধুচন্দ্রিমা শুরু হচ্ছে ঠিক এ ভাবেই। সফরের পরিকল্পনা, বিমানের টিকিট, হোটেল, ঘোরার জায়গা, এমনকি কোন দেশ-রাজ্যে যাচ্ছেন— সব জানেন এক জন। অন্য জন জানেন শুধু একটাই কথা, তিনি সারপ্রাইজ় পেতে চলেছেন। কেউ কেউ আবার সেটুকুও জানেন না। লুকিয়ে টিকিট কেটে, ভিসা করিয়ে, ব্যাগ গুছিয়ে রাখছেন, তার পর প্রায় ‘অপহরণ’ করে নিয়ে যাচ্ছেন সঙ্গীকে। পিছিয়ে নেই ভারত, এমনকি পশ্চিমবঙ্গও। এমনই ট্রেন্ডের সঙ্গে পা মিলিয়ে সদ্য মধুচন্দ্রিমা সেরে এসেছেন ৩০ বছরের সঞ্চারী কর এবং শান্তনু রায়। দু’জনেই কর্পোরেট সংস্থায় কর্মরত। কলকাতার যুগল বেঙ্গালুরুতে চাকরি করেন। সেখানেই নতুন সংসার পেতেছেন। মধুচন্দ্রিমার গন্তব্য সম্পর্কে ধারণা ছিল না সঞ্চারীর। স্বামী কেবল বলেছিলেন গন্তব্য সমুদ্রসৈকত, তাই সে রকমই পোশাক গুছিয়ে নিতে। পাসপোর্টও চেয়েছিলেন। তারিখও বলেছিলেন। কিন্তু কোথায় যাচ্ছেন, কত দিনের জন্য, জানতেন না সঞ্চারী। তার কথায়, ‘‘সারপ্রাইজ় হানিমুনের বিষয়ে আগে শুনেছিলাম। এই নিয়ে নানা রিলও দেখেছি। তবে নিজেও যে এমন কিছুর সাক্ষী হব ভাবিনি! শান্তনু শুধু বলেছিল, পাসপোর্ট তৈরি রাখতে। আর শুধু ভ্রমণের তারিখ। খুব জেদ করার পর জানতে পারি, সমুদ্রে যাব। সেই মতোই পোশাক কিনেছিলাম।’’ বিমানবন্দরে গিয়ে জানতে পারেন, মালয়েশিয়ার প্যাঙ্কর বলে একটি দ্বীপে যাবেন। তার পর সোজা রাজধানী কুয়ালালামপুর। এখানেই শেষ নয়। এর পর তারা উড়ে গিয়েছিলেন ইন্দোনেশিয়ার বালিতে। সেখানে কাটিয়েছিলেন এক সপ্তাহের বেশি সময়। সঞ্চারী বলছেন, ‘‘আমাকে কিছু না জানিয়ে সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে সব কিছু করেছিল শান্তনু। ভীষণ আনন্দ পেয়েছিলাম। নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছিল। দেশ হোক বা বিদেশ, মুখ ফুটে না বলতেই সঙ্গী যদি এমন কিছু করে, তা সত্যিই সারা জীবন মনে থেকে যায়।’’ মধুচন্দ্রিমার এই ধারা জনপ্রিয় হওয়ার পর এমনকি অনেক ট্রাভেল সংস্থাও এখন বিশেষ ভাবে এই ধরনের সফরের আয়োজন করছে। সেখানে আবার স্বামী-স্ত্রী কেউই জানেন না, কোথায় যাওয়া হবে। দম্পতির বাজেট, পছন্দ, সময় আর কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে গোটা সফরের দায়িত্ব নিচ্ছে তারা। গন্তব্য প্রকাশ করা হচ্ছে একেবারে শেষ মুহূর্তে, কখনও বিয়ের দিন, কখনও বিমানবন্দরে। মজার বিষয় হল, এই প্রবণতার কেন্দ্রবিন্দু কোনও দেশ নয়, কোনও রাজ্য নয়, কোনও সমুদ্রসৈকত নয়, আবার পাহাড়ও নয়। আসল আকর্ষণ হল অজানা অভিজ্ঞতা। একটা সময় ছিল, সফরে বেরিয়ে নতুন জায়গা দেখে মানুষ অবাক হতেন। এখন সেই অবাক হওয়ার সুযোগটাই যেন কমে গিয়েছে। হোটেলের ঘর কেমন, বারান্দা থেকে কী দেখা যায়, সকালের জলখাবারে কী মিলবে, কোন ক্যাফের কফি সবচেয়ে ভাল— সবই আগে থেকে মোবাইলের পর্দায় দেখে নেয়া যায়। ভ্রমণ শুরু হওয়ার আগেই যেন সফরের অর্ধেকটা ঘুরে ফেলা হয়ে যায়। দম্পতিরা বলছেন, সেই হারিয়ে যাওয়া বিস্ময়টাকে ফিরিয়ে আনতেই এই নতুন ভাবনা। যখন কোনও তথ্য থাকে না, তখন প্রতিটি মুহূর্ত যেন নতুন হয়ে ওঠে। বোর্ডিং পাস হাতে পাওয়াও একটা ঘটনা, বিমানের জানলা দিয়ে নিচে তাকানোও একটা ঘটনা। সেখান থেকে নতুন জায়গা আবিষ্কার করাও একটা অভিজ্ঞতা বটে। গন্তব্যে পৌঁছে সবই নতুন চোখে দেখার আনন্দ পাবেন। ফোনে রিল দেখে, তথ্য সংগ্রহ করে না রাখার অভিজ্ঞতা উপভোগ করবেন। নতুন প্রজন্মের ভ্রমণেও একটা বদল স্পষ্ট। এখন অনেকেই জায়গার চেয়ে অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। সমাজমাধ্যমের নিখুঁত ছবি তোলার চেয়ে, এমন একটা গল্প নিয়ে ফিরতে চাইছেন, যা বহু বছর পরেও বন্ধুদের আড্ডায় বলা যাবে। সবাই অবশ্য এই ধরনের সফরের অনুরাগী নন। অনেকের কাছে ভ্রমণের আনন্দ শুরুই হয় পরিকল্পনা দিয়ে। মানচিত্রে জায়গা খুঁজে দেখা, হোটেলের ছবি দেখা, রেস্তরাঁ বেছে নেয়া— এ সবই তাদের সফরের অংশ। আবার অন্য একদল মনে করেন, জীবনে সব উত্তর আগে থেকেই জেনে ফেললে রোমাঞ্চটাই হারিয়ে যায়। হয়তো সে কারণেই আজকের মধুচন্দ্রিমার অভিধানে নতুন একটি শব্দ জুড়ে গিয়েছে— ভরসা। সঙ্গীকে সম্পূর্ণ ভাবে ভরসা করা। তারই উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে নতুন প্রবণতা। কারণ সঙ্গীর পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে সব তথ্য নিয়ে তার সুবিধা-অসুবিধা বুঝেই সফরের পরিকল্পনা করতে হয়। তাই ভরসাই আসল। সুতরাং, নতুন এই ভ্রমণ-ট্রেন্ডে এক জনের হাতে সফরের নকশা, অন্য জনের হাতে শুধু সুটকেস। আর দু’জনের মাঝে চমক, ভরসা আর নতুন অভিজ্ঞতার আনন্দ। Post Views: 36 Post navigation টোটা বরাবরই সৃজনশীল, পারিবারিক ব্যবসায় মন ছিল না, বলিউডই ওকে যোগ্য সম্মান দিয়েছে