স্পোর্টস ডেস্ক :গত ফিফা বিশ্বকাপে তার দেশের জয়ে অতিপ্রাকৃত কিছুর ভূমিকা ছিল বলে বিশ্বাস করেন ডালিয়া ওয়াকার। “আমি মনে করি জাদুই আর্জেন্টিনাকে জিততে সাহায্য করেছে,” বলেন বুয়েন্স আয়ার্সের ৪১ বছর বয়সী এই নারী।বিবিসি ডালিয়া ছিলেন স্বঘোষিত ‘জাদুকর’ বা ‘ডাইনি’দের একটি বড় দলের অংশ, যারা লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টাইন দলের হয়ে মন্ত্রপাঠ ও নানা আচার পালন করতেন। এই নারীরা নিজেদের ‘লা ব্রুজিনেতা’ নামে ডাকতেন। ‘ব্রুজা’ শব্দের অর্থ ডাইনি, আর ‘লা স্কালোনেতা’ হলো বর্তমান কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে দলের ডাকনাম। এই দুই শব্দের সমন্বয়ে নারীরা ওই নাম বেছে নেন। ডালিয়ার ভাষায়, লা ব্রুজিনেতা নতুন যুগের জাদুবিদ্যা, মোমবাতি, প্রার্থনা ও তাবিজ ব্যবহার করে এসব আচার সম্পন্ন করতো। তারা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতেন এবং দলের পারফরম্যান্সের কোন দিকটিতে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেয়া দরকার তা নিয়ে আলোচনা করতেন। সবচেয়ে জনপ্রিয় কিছু রীতির মধ্যে ছিল প্রতিপক্ষ দলের নির্দিষ্ট খেলোয়াড়দের ক্ষমতা ‘স্থির করে দেয়া’– যেটা ডালিয়ার পছন্দ ছিল না। তিনি বরং বেশি ইতিবাচক আচারকে প্রাধান্য দিতেন, যেমন মোমবাতি জ্বালানো এবং ‘ভালো শক্তি’ পাঠানো। ২০২২ সালে কাতারে আর্জেন্টিনা জেতার পর লা ব্রুজিনেতা এটিকে তাদের প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে দেখেছিল। “আমার কাছে এটি সত্যিই ডাইনিদের বিশ্বকাপ ছিল,” বলেন ডালিয়া। তিনি জানান, এবারও তিনি একই আচার পালন করার পরিকল্পনা করছেন এবং তার বেদিতে জাতীয় দলের নীল ও সাদা রঙের মোমবাতি জ্বালাবেন। “আর্জেন্টিনায়, যদি কোনো কিছু কাজ করে, তাহলে পরেরবারও ঠিক একইভাবে তা পুনরাবৃত্তি করতে হয় (এটাই কুসংস্কারে বিশ্বাস),” বলেন তিনি। শুধু আর্জেন্টিনার সমর্থকরাই যে অতিপ্রাকৃত সহায়তা চান, তা নয়। পেরুর একদল শামান বা তান্ত্রিক ২০২২ সালের টুর্নামেন্টে তাদের দলকে যোগ্যতা অর্জনে সহায়তা করার জন্য রাজধানী লিমায় একটি আচার পালন করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার কাছে টাইব্রেকারে ৫–৪ গোলে হেরে যায় পেরু। আর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দৈনন্দিন জীবনের মতো ফুটবলেও আধ্যাত্মিকতার প্রভাব গভীরভাবে জড়িত। রীতিনীতি ও তাবিজকিছু মানুষের জন্য এর অর্থ হলো, লোকজ বিশ্বাসব্যবস্থা ও ঐতিহ্যবাহী নিরাময়কারীদের অনুসরণ। ২০০২ সালে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (ক্যাফ) তথাকথিত ‘টিম অ্যাডভাইজার’, যারা মূলত ছিল তান্ত্রিক, তাদের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে অংশগ্রহণকারী দলে কোনো ভূমিকা রাখা নিষিদ্ধ করে। তবুও, অনেক উৎসাহী সমর্থক আছেন যারা স্টেডিয়ামে নাচ ও উল্লাসের সময় এসব ঐতিহ্য অনুসরণ করেন– তাবিজ, বিশেষ গয়না ব্যবহার করেন, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আগুনও ছুড়ে দেন, বলছেন ফুটবল সাংবাদিক মাহের মেজাহি। গত বছরের নভেম্বরে নাইজেরিয়া যখন বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব থেকে বাদ পড়ে, তখন তাদের কোচ এরিক শেল প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআরসি) দলের বিরুদ্ধে ভুডু বা কালা জাদু ব্যবহার করার অভিযোগ তোলেন। ডিআরসির সাবেক প্রধান কোচ ফ্লোরাঁ ইবেনগে সেই অভিযোগকে “অর্থহীন” বলে উড়িয়ে দেন। কালা জাদুর ইঙ্গিত থাকার কারণেই অনেকেই এসব ঐতিহ্য চর্চায় অংশ নেয়ার বিষয়টি খোলাখুলি বলতে অনীহা প্রকাশ করেন। মেজাহি বলেন, “ফুটবল সাধারণত ইউরোকেন্দ্রিক”। “সবচেয়ে বড় ক্লাবগুলো সেখানে, বড় খেলোয়াড়রাও সেখানে খেলেন—তাই ইউরোপের বাইরে যা কিছু, তা কিছুটা সন্দেহের চোখে দেখা হতে পারে”। তবে তার মতে, এটি “আফ্রিকানদের লজ্জা পাওয়ার মতো কিছু নয়। এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের যা করি সেরকমই একটি বিষয়”। তিনি বলেন, আফ্রিকান “ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিক চর্চাকে পিছিয়ে থাকা বা তৃতীয় বিশ্বের বিষয় হিসেবে দেখার” প্রবণতা পশ্চিমা ধারণাকে শ্রেষ্ঠ বলে প্রতিষ্ঠা করে। তবে অনেকে মনে করেন, প্রতিপক্ষ দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে আচার পালন করা আর সাধারণভাবে ঈশ্বরের আশীর্বাদ কামনায় প্রার্থনা করার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। ‘ঈশ্বরই কেন্দ্রবিন্দু’মেজাহির মতে, আফ্রিকান ফুটবল সমর্থক ও দলগুলো খ্রিস্টধর্ম ও ইসলামসহ আব্রাহামীয় ধর্মগুলোকে অনেক বেশি খোলাখুলিভাবে গ্রহণ করে। উদাহরণ হিসেবে, আলজেরিয়ার সমর্থকদের একটি সাধারণ স্লোগান হলো আল্লাহর কাছে দলের সুরক্ষা ও সহায়তা কামনা করা। আর “বিশেষ করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো, ঘানা বা নাইজেরিয়া, প্রতিটি ম্যাচেই গসপেল সংগীত (খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের আশা জাগানিয়া গান) বাজায়,” বলেন মেজাহি। ঘানার ক্রীড়ামন্ত্রী কোফি ইড্ডি অ্যাডামস সম্প্রতি একটি গির্জার অনুষ্ঠানে সমর্থকদের জাতীয় দলের জন্য প্রার্থনা করতে বলেন, যাদের স্নেহভরে ‘দ্য ব্ল্যাক স্টারস’ বলা হয়। ঘানা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (জিএফএ) দেশটির দুই বৃহত্তম ধর্মীয় গোষ্ঠী– খ্রিস্টান ও মুসলিমদের কাছ থেকেও প্রার্থনা চেয়েছে। রাজধানী আক্রায় একটি জাতীয় খ্রিস্টান প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ‘ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ওঠার’ আগে ব্ল্যাক স্টারসের জন্য প্রার্থনা করা হয়–জিএফএ এমনটাই জানায়। এছাড়াও, টুর্নামেন্টের আগে জিএফএ দেশের প্রধান ইমামের সঙ্গে ইসলামিক প্রার্থনায় অংশ নেয়, যেখানে ইমাম জাতীয় দলের জন্য “দিব্য নির্দেশনা ও আশীর্বাদ কামনা করেন”- এক বিবৃতিতে জানানো হয়। আক্রায় অবস্থানরত সাংবাদিক নাথান লারেয়া বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, আমরা যা করি তার কেন্দ্রেই ঈশ্বর রয়েছেন”। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ঘানার সংস্কৃতিতে বিশ্বাসের গুরুত্ব। “মানবিক প্রচেষ্টা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি সেই বিশেষ আশীর্বাদ যা আমাদের প্রয়োজন- চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য”। “এ কারণেই প্রার্থনা করা এবং ঈশ্বরের পক্ষ থেকে সুরক্ষা ও দিকনির্দেশনা চাওয়া গুরুত্বপূর্ণ”। মাহের মেজাহির মতে, আফ্রিকার মতো আরেকটি দেশ আছে যেখানে বিশ্বাস ও ফুটবল গভীরভাবে জড়িত – সেটা হলো ব্রাজিল। “আমি ধর্মের এমন খোলামেলা প্রকাশ দেখেছিলাম ২০০২ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জয়ের সময়, তখন আমি ছোটো”। “কাকা নামের একজন খেলোয়াড় তার জার্সি খুলে দেখিয়েছিলেন ভেতরে ‘আমি যিশুর’ লেখা একটি টি-শার্ট– এটি আমার কাছে আকর্ষণীয় লেগেছিল”। মেজাহি বলেন, এটি ছিল “বিশ্বের জন্য একটি বার্তা”। এ বছরও টুর্নামেন্টের আগে ব্রাজিল দলের বিদায়ের সময় একই বার্তার প্রতিফলন দেখা যায়। দলটির বিমান উড্ডয়নের আগে রানওয়েতে ফায়ার ইঞ্জিন দিয়ে ‘ব্যাপটাইজ’ (ধর্মীয় এক ধরনের পবিত্রকরণ) করা হয়। বিমান চলাচলের ঐতিহ্যে সাধারণত প্রথম যাত্রা বা গুরুত্বপূর্ণ সফরের আগে এ ধরনের প্রতীকী আশীর্বাদ করা হয়। এবার ব্রাজিলের সমর্থকরা আশা করছেন, এটি হয়তো দেশটির রেকর্ড গড়া পাঁচটি বিশ্বকাপ জয়কে ছয়টিতে পরিণত করতে সাহায্য করবে। Post Views: 10 Post navigation এখনো ‘আসল’ ব্রাজিল দেখার অপেক্ষায় বিশ্বকাপ রাজশাহী তায়কোয়ানডো দোজাং এর আয়োজনে ২৬তম বেল্ট বিতরণী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হল