ফিফার পক্ষপাতিত্ব পাওয়ার গুজব আর রেফারিংয়ে সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়ে ফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত ট্রফি হাতে তোলা হলো না মেসির আর্জেন্টিনার। ১২০ মিনিটের ফাইনালে স্পেনের সমানে দাঁড়াতেই পারেনি ২০২২ এর চ্যাম্পিয়নরা।বিবিসি

বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ থেকে শুরু করে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার প্রায় প্রতি ম্যাচেই রেফারিং নিয়ে কিছু না কিছু বিতর্ক ছিল। এমনকি ফাইনালেও স্পেনের নিকো উইলিয়ামসের একটি গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।

আর্জেন্টিনাকে ফিফা সুবিধা দিচ্ছে – এই বিতর্ক টুর্নামেন্ট চলাকালীন এমন পর্যায়ে যায় যে মিশর মেসিকে সুবিধা দেয়া এবং আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের রেফারিং নিয়ে ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তোলে। আর্জেন্টিনার সাথে ম্যাচের কয়েকদিন পর একই ধরনের অভিযোগ তোলে আলজেরিয়াও।

আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার আইসা মান্দিকে মেসির করা একটি ট্যাকেলে রেফারি হলুদ বা লাল কার্ড না দেয়ায় তৈরি হয় আলোচনা।

আলজেরিয়ার আইসা মান্দিকে পিছন থেকে মেসি যখন ট্যাকেল করেন, তখন মেসির বুট মান্দির হাঁটুর পেছন দিকে লাগে। সাধারণ্ত এমন ট্যাকেলে লাল কার্ড দেয়া খুবই স্বাভাবিক বিষয় হলেও ঐ ক্ষেত্রে মেসি হলুদ কার্ডও পাননি।

ম্যাচ শেষে আলজেরিয়ার আইসা মান্দি ঐ ট্যাকেল নিয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় অভিযোগ তোলেন যে মেসি বিশ্বকাপের অন্যতম বড় তারকা হওয়ায় তাকে লাল কার্ড দেয়া হয়নি।

ম্যাচের দুইদিন পর ফিফার রেফারিং কমিশনের কাছে করা আলজেরিয়ার অভিযোগেও এই বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়া হয়।

ফুটবল বিশ্লেষক আর সাবেক ফুটবলাররা ঐ সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন।

কারো কারো মতে ঐ ট্যাকেলের জন্য মেসির লাল কার্ড পাওয়া উচিৎ ছিল।

আবার কেউ কেউ মনে করেন ম্যাচের পরিস্থিতি আর ট্যাকেলের গভীরতা বিবেচনা করেই রেফারি মেসিকে কার্ড দেননি।

রেফারির সিদ্ধান্তের সমর্থন করার পেছনে তাদের যুক্তি হলো, সেসময় মাঠের তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি দর্শকদের চেয়ে রেফারি ভালো বুঝেছেন।

অস্ট্রিয়া ম্যাচে ম্যাক আলিস্টারের ফাউল
গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় ম্যাচের এই ঘটনা নিয়ে ম্যাচের পরপর কয়েকজন ফুটবল বিশ্লেষক সমালোচনা করলেও মূলত এই ঘটনা ঘিরে আলোচনা শুরু হয় আর্জেন্টিনা-মিশরের ম্যাচের পর।

রাউন্ড অব সিক্সটিনে আর্জেন্টিনা মিশরের ম্যাচে মিশরের একটি গোল বাতিল হওয়ার পেছনে কারণ ছিল গোলের বিল্ডআপে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে মিশরের মারওয়ান আতিয়া ফাউল করা।

ঐ গোল বাতিল নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সময় অস্ট্রিয়া ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রথম গোলের বিতর্ক আবার সামনে আসে।

অস্ট্রিয়ার সাথে ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রথম গোলের আগে বিল্ডআপে ম্যাক আলিস্টার ট্যাকেল করেন শালগারকে, সেখান থেকে বল পেয়ে গোল করেন মেসি।

অস্ট্রিয়ার খেলোয়াড়রা আপিল করলেও ভিএআর রিভিউ করা হয়নি ঐ ক্ষেত্রে।

মিশর ম্যাচ ঘিরে একাধিক বিতর্ক
ম্যাক আলিস্টারের ঐ ট্যাকেল আলোচনায় উঠে আসে এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বিতর্কের জন্ম দেয়া আর্জেন্টিনা-মিশরের রাউন্ড অব সিক্সটিনের ম্যাচের পর।

লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউলের দায়ে মোস্তফা জিকোর গোল বাতিল ছাড়াও ঐ ম্যাচের শেষ দিকে হুলিয়ান আলভারেজের মোহাম্মদ সালাহকে বক্সের ভেতরে করা একটি ট্যাকেলও আলোচনা তৈরি করে।

সালাহকে করা ট্যাকেলের জন্য মিশরের খেলোয়াড় আর কোচিং স্টাফ আপিল করলেও রেফারি তা আমলে নেননি। তারপরই মিশরের কোচ ‘বৈষম্যমূলক’ আচরণ ও আর্জেন্টিনাকে সুবিধা দেয়ার অভিযোগ তোলেন এবং দাবি করেন যে মিশরের কাছ থেকে ম্যাচ ‘ছিনিয়ে’ নেয়া হয়েছে।

কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের সাথে আর্জেন্টিনা যখন ১-১ এর সমতায়, তখন ব্রিল এমবোলোর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখা নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। এমবোলো দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন ‘মিসটেইকেন আইডেন্টিটি রুল অনুযায়ী।

‘মিসটেইকেন আইডেন্টিটি রুল’ অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় যদি একটি ফাউলের জন্য হলুদ বা লাল কার্ড দেখে, কিন্তু ফাউলটি আসলে প্রতিপক্ষের কোনো খেলোয়াড়ের করা হয়ে থাকে, তাহলে ওই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে দায়ী খেলোয়াড়কে একই শাস্তি দেবেন রেফারি।

এই ক্ষেত্রে শুরুতে রেফারি আর্জেন্টিনার পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখিয়েছিলেন এমবোলোকে ফাউল করার জন্য। কিন্তু পরে ভিএআর জানাায় যে এমবোলো আসলে ডাইভ দিয়েছেন ফাউল আদায় করতে। ফলে পারেদেসের কার্ড বদলে সেটি এমবোলোকে দেয়া হয় এবং দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখা এমবোলোকে মাঠ ছাড়তে হয়।

সমালোচকদের অনেকে সেসময় মন্তব্য করেন যে, রেফারি এই ক্ষেত্রে এমবোলোকে কার্ড না দিলেও পারতেন। আবার অনেকের মতে, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এমবোলোর এমন অবিবেচকের মত আচরণ শাস্তি পাওয়ার মতোই অপরাধ।

এই ম্যাচের শেষদিকে আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের সময় লাউতারো মার্টিনেজের গোল উদযাপনের সময় তাকে কেন হলুদ কার্ড দেয়া হয়নি সেটি নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়।

গোল দিয়ে মার্টিনেজ মাঠের সীমানা টপকে দর্শকদের কাছে গিয়ে গোল উদযাপন করেন, যেটি বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী হলুদ কার্ড দেখার মত অপরাধ।

আর ঐ ম্যাচে আগে থেকে একটি হলুদ কার্ডে থাকা লাউতারো দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখলে সেমিফাইনালে খেলতহে পারতেন না এবং ইংল্যান্ডের সাথে জয়সূচক গোলটিও করতে পারতেন না।

তবে এমন নানা অভিযোগ, সমালোচনা আর বিতর্ক থাকলেও পুরো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যে অন্যতম সেরা দল হিসেবে ফাইনাল খেলেছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

মিশর বা ইংল্যান্ডের সাথে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফেরা বা কেপ ভার্দে আর সুইজারল্যান্ডের সাথে দর্শনীয় ফাইট দেয়ার মাধ্যমেই তাদের খেলার মান বুঝিয়েছে তারা।

আর আর্জেন্টিনার মাঠের খেলার গুণগত মানের সবচেয়ে বড় প্রশংসা সম্ভবত করেছেন বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের কোপ লুই দে লা ফুয়েন্তে।

ফাইনালের আগে প্রেস কনফারেন্সে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল আর্জেন্টিনা ‘ডার্টি ফুটবল’ খেলছে বলে তিনি মনে করেন কিনা।

জবাবে স্প্যানিশ কোচ বলেছিলেন, “না, প্লিজ এমন মনে করবেন না। এই দলটা একটি কোপা আমেরিকা জিতে তারপর বিশ্বকাপ জিতেছে।

তারপর আবার কোপা আমেরিকা জিতেছে এবং এখন আবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে যাচ্ছে। পাঁচ বছর ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলে তারা ধারাবাহিক পারফর্ম করছে। ফুটবল ইতিহাসের খুব কম দলই এই ধরনের অর্জন করে দেখিয়েছে”

“সুতরাং তাদের জন্য আমার মধ্যে শুধু শ্রদ্ধাবোধই কাজ করে।”

Article Information
Author,নাগিব বাহার
Role,বিবিসি নিউজ বাংলা

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *