·
এবার কি কৃষক হাইব্রিড ধানের বীজ নিজেই রাখতে পারবেন?
ধান গবেষণায় এমন একটি সাফল্যের খবর এসেছে, যেটা ভবিষ্যতে কৃষিব্যবস্থার চেহারাই বদলে দিতে পারে। চীনের একদল বিজ্ঞানী এমন একটি হাইব্রিড ধান তৈরি করেছেন, যার বীজ পরবর্তী প্রজন্মেও প্রায় হুবহু একই বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে পারে। অর্থাৎ, কৃষক যদি এই প্রযুক্তির ধান চাষ করেন, তাহলে তাকে প্রতিবছর নতুন হাইব্রিড বীজ কিনতে নাও হতে পারে। নিজের জমিতে উৎপাদিত বীজই পরের মৌসুমে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।

  • সমস্যাটা কোথায় ছিল?
    হাইব্রিড ধানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো হাইব্রিড ভিগর বা সংকর শক্তি। দুটি ভিন্ন জাতের ধান সংকরায়ণ করলে প্রথম যে প্রজন্মের (F₁) গাছ তৈরি হয়, সেটা সাধারণত বেশি ফলন দেয়, রোগবালাই ভালোভাবে সহ্য করতে পারে এবং পরিবেশের সঙ্গে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
    কিন্তু এই সুবিধা মাত্র প্রথম প্রজন্ম পর্যন্তই থাকে। সেই গাছের বীজ পরের বছর বপন করলে জিনগুলোর স্বাভাবিক পুনর্বিন্যাসের কারণে হাইব্রিডের বৈশিষ্ট্য ভেঙে যায়। ফলে ফলন কমে যায় এবং গাছগুলো আর একরকম থাকে না। এ কারণেই কৃষকদের প্রতি বছর নতুন হাইব্রিড বীজ কিনতে হয়।
  • চীনা বিজ্ঞানীরা কী করলেন?
    এই সমস্যার সমাধানে চীনা গবেষকরা চমৎকার একটি জেনেটিক কৌশল ব্যবহার করেছেন। প্রথমে তাঁরা PAIR1, REC8 এবং OSD1 নামের তিনটি জিনের কার্যক্রম পরিবর্তন করেন। এর ফলে স্বাভাবিক মিয়োসিস (meiosis) প্রক্রিয়াটি কার্যত মাইটোসিসের (mitosis) মতো আচরণ করতে শুরু করে। অর্থাৎ, ডিম্বাণু তৈরির সময় জিনের স্বাভাবিক অদলবদল আর হয় না, এবং হাইব্রিডের জিনগত গঠন অক্ষুণ্ন থাকে।
    কিন্তু শুধু এটুকু করলেই কাজ হতো না। কারণ এর পাশাপাশি স্বাভাবিক বীজ উৎপাদনও বজায় রাখতে হবে। এজন্য বিজ্ঞানীরা ধানের পরাগরেণুতে সক্রিয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর শনাক্ত করেন। তারপর এর কার্যক্রম এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন, যাতে পরাগায়নের পর ভ্রূণের বিকাশ ঠিকভাবে শুরু হয়, কিন্তু হাইব্রিডের জিনগত বৈশিষ্ট্যও অপরিবর্তিত থাকে।
    এই সমন্বিত প্রযুক্তির ফলেই তাঁরা ৯৯ শতাংশেরও বেশি ক্লোনাল হাইব্রিড বীজ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছেন, একই সঙ্গে বীজ ধারণক্ষমতাও প্রায় স্বাভাবিক রাখতে পেরেছেন।
  • এর গুরুত্ব কতখানি?
    উদ্ভিদবিজ্ঞানে বহু বছর ধরেই একটি স্বপ্ন ছিল হাইব্রিড ফসল যেন নিজের উন্নত বৈশিষ্ট্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাখতে পারে। এই স্বপ্নের নাম সিনথেটিক অ্যাপোমিক্সিস (Synthetic Apomixis)।
    চীনের এই গবেষণা সেই স্বপ্নকে বাস্তবের অনেক কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। যদি ভবিষ্যতে মাঠপর্যায়ে এটি সফলভাবে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে কৃষকদের প্রতি বছর নতুন হাইব্রিড বীজ কেনার প্রয়োজন অনেকটাই কমে যেতে পারে। বীজ উৎপাদনের খরচ কমবে, উন্নত জাতের ধান আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে এবং সারা পৃথিবীর খাদ্যনিরাপত্তায়ও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
    • এখনও কিছু পথ বাকি
    এটি নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী গবেষণা। তবে প্রযুক্তিটি এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি মাঠপরীক্ষা, নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের পরই বোঝা যাবে এটি বাণিজ্যিকভাবে কতটা সফল হবে।
  • শেষ কথা
    হাইব্রিড ধানের জনক হিসেবে পরিচিত চীনা বিজ্ঞানী ইউয়ান লংপিং একসময় এমন একটি ধানের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যার হাইব্রিড শক্তি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অটুট থাকবে। এই নতুন গবেষণা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে একটি বিশাল পদক্ষেপ। যদি এটি শেষ পর্যন্ত সফল হয়, তাহলে শুধু ধান নয়, এর পাশাপাশি গম, ভুট্টা এবং আরও অনেক হাইব্রিড ফসলের চাষাবাদেও এক নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।
    চায়না ন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কেজিয়ান ওয়াং-এর নেতৃত্বে একদল গবেষক এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন। গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি Vita জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
    এই গবেষণাটি সম্বন্ধে বিস্তারিত জানতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন: https://www.biorxiv.org/content/10.1101/2025.10.16.682968v1?
    BRRI Rice Museum পেজ থেকে

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *