সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান নিতে চেয়ে আলিপুর আদালতের অতিরিক্ত জেলা বিচারকের কাছে আবেদন করেছিলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার দম্পতি। কিন্তু অভিযোগ, তাদের আবেদন খারিজ করে দেয়া হয়।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

সারোগেসিতে ইচ্ছুক দম্পতির বয়স বা স্বাস্থ্য যাচাই করা ম্যাজিস্ট্রেটের কাজ নয়। তা করার জন্য ভিন্ন কর্তৃপক্ষ রয়েছেন। ম্যাজিস্ট্রেট কেবল সারোগেসি-পরবর্তী আইনি দিকগুলি বিবেচনা করবেন। এক দম্পতির মামলায় রায় ঘোষণা করে এমনটাই জানাল কলকাতা হাই কোর্ট। ওই মামলায় ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশও খারিজ করে দেয়া হয়েছে। নতুন করে সাত দিনের মধ্যে তাকে দম্পতির আবেদন বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।

সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান নিতে চেয়ে আলিপুর আদালতের অতিরিক্ত জেলা বিচারকের কাছে আবেদন করেছিলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দা সৌমেন সেন এবং তার স্ত্রী। তার আগে জেলা মেডিক্যাল বোর্ড থেকে প্রয়োজনীয় শংসাপত্রও তারা সংগ্রহ করেন। কিন্তু অভিযোগ, দম্পতির মেডিক্যাল শংসাপত্র এবং সারোগেট মায়ের বিভিন্ন শংসাপত্র যাচাই করে তাদের আবেদন খারিজ করে দেয়া হয়। ম্যাজিস্ট্রেট জানান, তাদের শংসাপত্রগুলির বৈধতার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সারোগেট মায়ের মানসিক সুস্থতার শংসাপত্রে প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব রয়েছে। তা ছাড়া, আবেদনকারী বাবার বয়স নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন ম্যাজিস্ট্রেট। বলা হয়, ৫৫ বছর পেরিয়ে যাওয়ায় সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান নেয়ার উপযুক্ত নন তিনি। এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেই হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন দম্পতি।

কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি কৌশিক চন্দের এজলাসে সারোগেসি সংক্রান্ত মামলাটির শুনানি ছিল। বিচারপতি জানান, সারোগেসি আইনে ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা সীমিত। দম্পতির বয়স বা স্বাস্থ্য তিনি যাচাই করতে পারেন না। ম্যাজিস্ট্রেট কেবল নিশ্চিত করবেন সারোগেট মা স্বেচ্ছায় এই পদ্ধতিতে সম্মতি দিয়েছেন কি না, তাকে প্রতারণা করা হয়েছে কি না। ভবিষ্যতে সারোগেট মা ওই সন্তানের অভিভাবকত্ব দাবি করবেন না— এই শর্তও ম্যাজিস্ট্রেটকে নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ, কেবল আইনি দিকগুলি তিনি বিবেচনা করতে পারেন। অন্য কিছু নয়।

দম্পতির তরফে আইনজীবী কল্লোল বসু এবং আত্রেয়া চক্রবর্তীর সওয়াল, সারোগেসির নিয়ম মেনেই প্রথমে জেলা মেডিক্যাল বোর্ড থেকে শংসাপত্র সংগ্রহ করেছিলেন তাদের মক্কেল। পরে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আইনি অনুমতি নিতে যান তারা। কিন্তু বয়স এবং স্বাস্থ্যের কথা বলে আবেদন খারিজ করে দেয়া হয়। আইনজীবীদের যুক্তি, গত দু’বছর ধরে সারোগেসির আইনি অনুমতির জন্য ঘুরতে হচ্ছে দম্পতিকে। মামলার কারণেই শংসাপত্রের বৈধতার মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে। তাদের বক্তব্য বিবেচনা করে ম্যাজিস্ট্রেটকে তার আইনি ক্ষমতা মনে করিয়ে দিয়েছে হাই কোর্ট। বিচারপতি চন্দের পর্যবেক্ষণ, সারোগেসি আইন অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেটের এত ক্ষমতা নেই। দম্পতির আবেদন এই সমস্ত কারণে খারিজ করার এক্তিয়ারও তার নেই। ম্যাজিস্ট্রেটকে দেখতে হবে ওই দম্পত্তি সন্তান জন্মের পর তার দায়িত্ব নেবেন কি না। তারা শিশুকে পরিত্যাগ করবেন না এবং তাকে প্রতিপালনের প্রয়োজনীয় আর্থিক ও সামাজিক সামর্থ্য তাদের রয়েছে— নিশ্চিত করতে হবে ম্যাজিস্ট্রেটকে। অন্য কিছু তার বিবেচনা করার প্রয়োজন নেই।

হাই কোর্টের নির্দেশ, নতুন করে দম্পতির আবেদন বিবেচনা করে সাত দিনের মধ্যে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট। তারা যে মামলার জন্য অনেক সময় ব্যয় করেছেন, তা-ও বিবেচনা করতে হবে।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালের সারোগেসি (রেগুলেশন) আইন অনুযায়ী, টাকা নিয়ে গর্ভ ভাড়া দেয়া বা বাণিজ্যিক সারোগেসি নিষিদ্ধ। বাবা-মা হতে ইচ্ছুক দম্পতি যদি শারীরিক সমস্যার কারণে সন্তানধারণে অক্ষম হন, তারা সারোগেসির দ্বারস্থ হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ‘সারোগেট মা’ হিসেবে কোনও উপযুক্ত মহিলাকে নির্বাচন করতে হয়। তিনি ওই দম্পতির সন্তান নিজের গর্ভে ধারণ করেন এবং জন্মের পর সেই সন্তানকে বাবা-মায়ের হাতে তুলে দেন। গর্ভে ধারণ করলেও সদ্যোজাতের উপর কোনও আইনি অধিকার থাকে না সারোগেট মায়ের। আইনত তিনি এর জন্য কোনও টাকাও নিতে পারেন না। নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে আইনি অনুমতি দিয়ে সারোগেসি সম্পন্ন হয়। দম্পতির শারীরিক সমস্যা না থাকলে এই অনুমতি মেলে না।

·

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *