আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জোসেফ ভিজয়ের ‘বিশেষ বন্ধু’ ও তামিল অভিনেত্রী তৃষা কৃষ্ণণকে উদ্দেশ করে বিরোধী নেতা উদয়নিধি স্ট্যালিন একটি ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবেশ তৈরি হয় গোটা রাজ্যজুড়ে।বিবিসি

মঙ্গলবার উদয়নিধি স্ট্যালিনকে গ্রেফতার করে তামিলনাড়ু পুলিশ। পরে অবশ্য আদালতের নির্দেশে তাকে ছেড়েও দেয়া হয়।

তবে এই বিতর্কের সঙ্গে যোগ রয়েছে কাবেরী নদীর জলবণ্টন নিয়ে চলতে থাকা বহু পুরোনো একটি ইস্যুর।

কাবেরী জল বণ্টন ইস্যুতে সোমবার একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে ডিএমকে। সেখানে বক্তৃতা দেয়ার সময়ে মি. স্ট্যালিন তামিল অভিনেত্রী সর্ম্পকে মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ শাসকদল টিভিকের। যার জেরে তারা থানায় মি. স্ট্যালিনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে। গ্রেফতার করা হয় উদয়নিধিকে।

আদালতে আগাম জামিনের আবেদন জানান উদয়নিধি স্ট্যালিন। আদালত তাকে চৌঠা অগাস্টেই মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দেয়।

অভিনেত্রীকে নিয়ে কী মন্তব্য করেছিলেন উদয়নিধি?
বিবিসি তামিলের খবর অনুযায়ী, কাবেরী ইস্যুতে সোমবার থাঞ্জাভুরে টিভিকে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেছিল বিরোধী দল ডিএমকে।

প্রতিবাদ চলাকালে বিরোধী নেতা উদয়নিধি স্ট্যালিন অভিযোগ করেন যে, মুখ্যমন্ত্রী জোসেফ ভিজয় কাবেরী নদীর জল নিয়ে সমস্যার ব্যাপারে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

তিনি বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো ডিএমকে-র বিরুদ্ধে মামলা করা।”

মি. স্ট্যালিন সোমবারের ওই সভা থেকে তার ২২ মিনিটের বক্তব্যে তামিল ভাষায় কিছু ‘নারী বিদ্বেষী’ মন্তব্য করেন বলেও অভিযোগ ওঠে এবং তা নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। তার মন্তব্য মি. ভিজয় ও তার অভিনেত্রী বন্ধুর সম্পের্কর প্রতি কুরুচিকর ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন টিভিকে দলের সর্মথকরা।

সভায় তার বক্তৃতা চলাকালীন ডিএমকে দলের সর্মথকরা হঠাৎ তামিল অভিনেত্রী তৃষা কৃষ্ণণের নাম নিয়ে স্লোগান তোলে। জবাবে উদয়নিধি স্ট্যালিন তামিলে যা বলেন তার আপাত অনুবাদ হলো, “যেখানেই জল আসুক, আসুক বা না আসুক, এখানে জল আসা উচিত।”

যদিও এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি স্পষ্ট করে দেন যে তিনি কাবেরী নদীর জলের কথা বলছিলেন। তবে অনেকেই এটিকে অভিনেত্রীর প্রতি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বলে দাবি করছেন।

উদয়নিধি স্ট্যালিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে টিভিকে থাঞ্জাভুর (পূর্ব) থানায় অভিযোগ দায়ের করে। তাদের অভিযোগ ছিল, বিক্ষোভে উপস্থিত জনগণের স্লোগানের জবাব দেয়ার দাবি করলেও তিনি আসলে ‘দ্ব্যর্থবোধক’ এবং ‘আপত্তিকর’ মন্তব্য করেছেন।

মি. স্ট্যালিনের বিরুদ্ধে নয়টি ধারায় মামলা করা হয়, যার মধ্যে নারীর মর্যাদাহানিকর কথা বলা, দাঙ্গায় উসকানি দেয়া, শান্তি বিঘ্নিত করা এবং অশ্লীল কথা বলা প্রভৃতি অভিযোগ ছিল।

অভিযোগে তারা আরও জানান ডিএমকে-র আইটি শাখা তাদের সামাজিক মাধ্যমের পেজে মি. স্ট্যালিনের বক্তৃতার দুই মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট ও প্রচার করেছে।

এমনকি জাতীয় মহিলা কমিশনেও অভিযোগ জানায় শাসক দল টিভিকে।

কেবল টিভিকে নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও এই মন্তব্যকে মুখ্যমন্ত্রী জোসেফ ভিজয়ের প্রতি অপমান বলে মনে করেছেন।

উদয়নিধি স্ট্যালিন বিগত ডিএমকে সরকারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তার উপমুখ্যমন্ত্রীর পদে আসীন হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন টিভিকে সরকারের মন্ত্রী এন আনন্দ।

প্রবীণ বিজেপি নেতা থামিলিসাই সৌন্দররাজন এবং তামিলনাড়ু কংগ্রেস নেতা মানিকম ঠাকুর সহ বেশ কয়েকজন নেতা উদয়নিধি স্ট্যালিনের মন্তব্যের সমালোচনা করেন।

ডিএমকে সংসদ সদস্য মিজ. কানিমোঝি বিরোধীদল নেতার গ্রেফতার হওয়ার ঘটনাটিকে আইনের লঙ্ঘন বলেন।

ডিএমকে-র কোষাধ্যক্ষ টি আর বালু মি. স্ট্যালিনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ খারিজ করে দিয়ে বলেন, “উদয়নিধি কোনো নির্দিষ্ট নারী সম্পর্কে কিছু বলেননি এবং পুরো বিষয়টি গণমাধ্যমে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।”

উদয়নিধিকে গ্রেফতার ও আদালতের রায়
মঙ্গলবার চেন্নাইয়ে নিজের বাসভবন থেকে গ্রেফতার হন এম কে স্ট্যালিনের পুত্র উদয়নিধি স্ট্যালিন।

পুলিশের গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়ার সময় উদয়নিধি স্ট্যালিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমার বক্তব্যকে বিকৃত করে আমার সর্ম্পকে ভুয়ো খবর রটানো হচ্ছে। আমাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে।”

তিনি বলেন, “সরকার কৃষকদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। মেকেরদাতু বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেনি। আমি বলেছিলাম যে মুখ্যমন্ত্রীর এ বিষয়ে কথা বলা উচিত।

মুখ্যমন্ত্রী জোসেফ ভিজয়কে কটাক্ষ করে তিনি আরও বলেন যে, “মুখ্যমন্ত্রী এবং সমস্ত মন্ত্রীরা কেবল পর্দাতেই বেঁচে আছেন।”

উদয়নিধি ছাড়া পাওয়ার পর উচ্ছাস দেখা যায় ডিএমকে সর্মথকদের মধ্যে
ছবির ক্যাপশান,মঙ্গলবার রাতে থানা থেকে ছাড়া পান উদয়নিধি
থাঞ্জাভুর দক্ষিণ থানায় উদয়ানিধির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হলেও, তাকে চেঙ্গিপট্টি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। থানার বাইরে বিপুল সংখ্যক ডিএমকে সমর্থক পৌঁছে যায় এবং পুলিশের সঙ্গে তাদের তর্ক-বিতর্কে থানার বাইরে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়।

থাঞ্জাভুরে মামলা নথিভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাকে কেন চেঙ্গিপট্টি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে ডিএমকে সমর্থকরা প্রশ্ন তোলেন।

ডিএমকে-র আইনজীবী সারাভানান সংবাদমাধ্যমকে জানান পুলিশ উদয়ানিধিকে হেনস্থা করছে। যদিও পুলিশের দাবি থাঞ্জাভুরে ডিএমকে সর্মথকদের ভিড় এড়াতেই তাকে অন্য থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

মাদ্রাজ হাইকোর্টে আগাম জামিনের মামলা করে ডিএমকে। মঙ্গলবার দুপুরেই সেই মামলার শুনানি হয়। আদালত তদন্ত শেষ করে মঙ্গলবারই উদয়নিধিকে মুক্ত করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি বিচারপতি এও বলে যে উদয়নিধিকে পুলিশের তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে।

দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর মঙ্গলবার রাত প্রায় ৮টা ১৫ মিনিট নাগাদ উদয়নিধি থানা থেকে বেরিয়ে আসেন।

কেন তৃষা কৃষ্ণণ জড়িয়ে গেলেন রাজনৈতিক বিতর্কে?
তৃষা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তামিল সিনেমার সঙ্গে যুক্ত। তিনি তামিল অভিনেতা ভিজয়ের সঙ্গেও কাজ করেছেন যিনি বর্তমানে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এবং টিভিকে-র প্রধান।

দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে বলেও গুঞ্জন শোনা যায়, তবে এখন পর্যন্ত তাদের কেউই তা স্বীকার করেননি।

কাবেরী জলবন্টন ইস্যু কী?
৮০২ কিলোমিটার দীর্ঘ কাবেরী নদীর জল বন্টন নিয়ে ভারতের দুই রাজ্য তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকের বিবাদ বহু পুরোনো। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ ভিজয়ের সরকার কর্ণাটকের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত কাবেরী জল ছাড় না দেয়ার অভিযোগ তুলে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে।

সম্প্রতি কাবেরী ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি কাবেরী ওয়াটার রেগুলেশন কমিটির সুপারিশ মেনে নেয়। যাতে বলা আছে, আপাতত ১৫ দিন তামিলনাড়ুতে প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার কিউসেক কাবেরী নদীর জল পাঠাতে হবে।

কিন্তু তামিলনাড়ুতে কাবেরীর জল পাঠাতে নারাজ কর্নাটকের কৃষকরা ও বিক্ষোভকারীরা। তাদের বক্তব্য, কর্নাটকে এমনিতেই জলের সমস্যা রয়েছে। তামিলনাড়তে নদীর জল পাঠানো হলে সমস্যা বাড়বে কৃষকদের।

যা নিয়ে দুই রাজ্যের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক টালবাহানা শুরু হয়েছে। এমনকি এর প্রতিবাদে কর্ণাটকে তামিননাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী বিজয় অভিনীত সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘জননয়গণ’ দেখানো আটকে দেয়া হয়।

সংবাদ সংস্থা এএনআই-এর তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি কর্ণাটকের বিজেপি সভাপতি বিওয়াই বিজয়েন্দ্র কাবেরি জলবণ্টন নিয়ে সমঝোতার রাস্তায় আসার জন্য একটি চিঠি লেখেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী ভিজয়কে। তার মধ্যেই স্টালিনের মন্তব্য নতুন করে এই ইস্যুতে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করল।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *