নেপালের ভোটেকোশী নদীতে হড়পা বানের কারণে মৃতের সংখ্যা আরও বেড়েছে। নেপালের সংবাদমাধ্যম ‘কাঠমান্ডু পোস্ট’ জানিয়েছে, এই বিপর্যয়ে এখনও পর্যন্ত অন্তত ১৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনও নিখোঁজ বহু।

নিউটার্ন ডেস্ক :

ভূমিকম্প নয়, তুষারধসের কারণেই ভয়াবহ হড়পা বান এসেছিল নেপালের ভোটেকোশী নদীতে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর এই বিষয়ে প্রায় নিশ্চিত আমেরিকার ভূতত্ত্ব পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস জিয়োলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস)। বুধবার রাতে ওই সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, প্রাথমিক ভাবে ভূতাত্ত্বিক কম্পনকে ভূমিকম্প বলে মনে করা হচ্ছিল, তা আদতে হিমবাহধস। হিমবাহ কাদামাটির তাল নিয়ে নদীর অববাহিকার দিকে নামতেই ওই বিপর্যয় ঘটে বলে দাবি করেছে ওই মার্কিন সংস্থা।আনন্দবাজার ডট কম

অন্য দিকে, নেপালের ভোটেকোশী নদীতে হড়পা বানের কারণে মৃতের সংখ্যা আরও বেড়েছে। নেপালের সংবাদমাধ্যম ‘কাঠমান্ডু পোস্ট’ জানিয়েছে, এই বিপর্যয়ে এখনও পর্যন্ত অন্তত ১৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনও নিখোঁজ বহু। বুধবার রাত পর্যন্ত ২৯১ বিদেশি-সহ অন্তত ৩৮৪ জন পর্যটকের কোনও খোঁজ মেলেনি। তাদের মধ্যে ১৪১ জন ভারতীয় (৩৭ অনাবাসী-সহ)। তাদের খোঁজে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’ জানাচ্ছে, তারা সকলেই কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনের জন্য যাচ্ছিলেন।

হড়পা বানে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেপালের তিব্বত সংলগ্ন জেলা রাসুয়া। তুলনায় কম হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নুয়াকোট এবং ধারিং জেলাও। কাদামাটির প্রবল স্রোতে বিপর্যয় ও প্রাণহানির খবর এসেছে নেপাল সীমান্ত লাগোয়া তিব্বতের স্থলবন্দর জিরঙেও। নেপালের সংবাদমাধ্যমের একাংশের আশঙ্কা, আগামী ২৪ ঘণ্টায় মৃত ও নিখোঁজের তালিকা দীর্ঘতর হতে পারে।

কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাসুয়ায় আনুমানিক ৫০ হাজার মানুষের বাস। তিব্বত থেকে নেপালে প্রবেশ করে এই জেলা দিয়েই বয়ে গেছে ভোটেকোশী নদী। বুধবার সাড়ে ৮টার কিছু পরে আচমকা নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমান, তিব্বতের দিক থেকে প্রবেশ করেছে বন্যার জল। প্রাথমিক ভাবে খবর, চিন সীমান্তবর্তী তিমুরে এবং স্যাব্রুবেসী এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাসুয়ার জেলাশাসক নগেন্দ্র পারিয়ার রয়টার্সকে জানান, বেশ কিছু গ্রামীণ এলাকা ভেসে যাওয়ার খবর মিলেছে। তিনি বলেন, “প্রচুর সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি এবং ব্যাপক হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে।’’ বুধবার নেপাল পার্লামেন্টে সে দেশের বিদেশমন্ত্রী শিশির খনাল জানান, সকাল ৮:৩৭ নাগাদ একটি ভূমিকম্প হয়। এর পর একটি তুষারধস ঘটে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই নামে হড়পা বান।

ইউএসজিএস অবশ্য জানাচ্ছে, ৮টা ৩৭ মিনিটে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে কোনও ভূমিকম্প হয়নি। যে ঘটনাকে ৪.৪ মাত্রার ভূকম্পন বলে মনে করা হয়েছিল, সেটি আদতে হিমবাহধস এবং তজ্জনিত কারণে কাদামাটির স্রোত নেমে আসা। ভূবিজ্ঞানীদের একাংশ প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পরে জানিয়েছিলেন, তুষারধসের জেরে পাথর ও বরফের স্তূপে অবরুদ্ধ হয়েছিল নদীর গতিপথ। জমে যাওয়া জলের চাপে হঠাৎই সেই ‘অবরোধ’ ভেঙে যায়। ফলে সৃষ্টি হয় হড়পা বান।

নেপালে প্রবেশের পর ভোটেকোশী নদী গিয়ে মিশেছে ত্রিশুলি নদীতে। দুর্যোগের জেরে ত্রিশুলি নদী তীরবর্তী এলাকাগুলিতেও সতর্কতা জারি করে স্থানীয় প্রশাসন। রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ান এবং গোর্খা এলাকায় নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলেছে নেপালের দুর্যোগ মোকাবিলা দফতর। নদী তীরবর্তী এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তুষারধসের কারণে হিমালয় পর্বতের বিভিন্ন অঞ্চলে হিমবাহ ভেঙে হড়পা বানের বিপদসঙ্কেত দেওয়া হয়েছিল ২০১৯ সালের এক গবেষণায়। তাতে বলা হয়েছিল, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে এই শতাব্দীর গোড়া থেকে শুরু করে প্রতি বছর দেড় ফুটেরও বেশি উচ্চতার বরফ গলে যাচ্ছে হিমালয়ের হিমবাহগুলিতে। ভারত, চিন, নেপাল, ভুটান, চিন-অধিকৃত তিব্বতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ৪০ বছর ধরে উপগ্রহের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি করা গবেষণাপত্রটি ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছিল। সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা জানিয়েছিলেন, ১৯৭৫ থেকে ২০০০ পর্যন্ত যে গতিতে বরফ গলছিল হিমালয়ের হিমবাহগুলিতে, ২০০০ সালের পর থেকে গলছে তার দ্বিগুণ গতিতে। এর মধ্যেই তিব্বতের মানস সরোবরের অদূরে আনসি হিমবাহ থেকে উৎপন্ন ইয়ারলুং সাংপো নদীর নিম্ন অববাহিকায় চিনের বৃহত্তম বাঁধ নির্মাণকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তিব্বত থেকে ভারতে প্রবেশের পরে এই ইয়ারলুং সাংপোর নাম হয়েছে ব্রহ্মপুত্র। আবার ব্রহ্মপুত্র বাংলাদেশে প্রবেশের পরে নাম নিয়েছে যমুনা! ফলে হড়পা বানের জেরে চিনের বাঁধে বিপর্যয় ঘটলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে ভারত এবং বাংলাদেশেও।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *