নিউটার্ন ধর্ম ডেস্ক : ইসলামী পরিভাষায় মুজিজা হলো নবী ও রাসুলদের থেকে প্রকাশিত এমন এক অলৌকিক ঘটনা, যা তাঁর নবুয়তের প্রমাণস্বরূপ। প্রকৃতপক্ষে মুজিজার প্রয়োজনীয়তা শুধু সাধারণ মানুষের জন্য। জ্ঞানবান লোকের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যাবতীয় অবস্থা এবং সুমহান ব্যক্তিত্বই এক অপূর্ব মুজিজা। আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) বলেন, ‘আমি তাঁর মুখমণ্ডলের প্রতি নিরীক্ষণ করা মাত্রই বুঝতে পারলাম যে এই চেহারা মিথ্যাবাদী নয়।’ আর নবীর চেহারা অসাধারণ কেন হবে না, যখন ওলিদের চেহারার অবস্থা এই রূপ—(কবির ভাষায়) ‘জ্ঞানী লোকের দৃষ্টির সম্মুখে আল্লাহওয়ালা লোকের ললাটদেশের জ্যোতি গোপন থাকতে পারে না। আল্লাহওয়ালা লোকের জন্য আল্লাহর নূর প্রকাশ্যে দেখিতে পাওয়া যায়, যদি তুমি সত্যাদর্শী অন্তরের অধিকারী হও।’আর এই নূর দেখেই সত্য উপলব্ধি করা যায়, বর্ণনার প্রয়োজন হয় না। এক আল্লাহপ্রেমিক বলেন, ‘যদি চিত্রকর সেই চিত্তবিনোদী প্রিয়তমের চিত্র অংকন করতে চায়, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না—তার ভাবভঙ্গির চিত্র কিভাবে আঁকবে।’

এ জন্য কোনো তত্ত্বজ্ঞানী আলেম বলেন, মুজিজা নবুয়তের প্রমাণ নয়। মূলত তারা বোঝাতে চায় জ্ঞানবান ও বোধমান লোকের জন্য মুজিজাই নবুয়তের একমাত্র প্রমাণ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আখলাক ও কার্যকলাপও তাঁর নবুয়তের প্রমাণ। তবে সাধারণ মানুষের জন্য মুজিজা আবশ্যক। পৃথিবীতে জ্ঞানবান লোকের সংখ্যা কম এবং সাধারণ মানুষের সংখ্যা বেশি। এ জন্য নবী-রাসুলদের মুজিজার অধিকারী হওয়া আবশ্যক। সাধারণ মানুষের জন্য যখন মুজিজা নবীর নবুয়তের প্রমাণ, তখন জ্ঞানী লোকের জন্য কেন তা হবে না? তাদের জন্য মুজিজা আরো ভালোভাবে নবুয়তের প্রমাণ।

হিজরতের আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মক্কায় অবস্থান করছিলেন, তখন পারস্য ও রোমানদের ভেতর সংঘাত তীব্র হলো। পারস্যের বাহিনী জয়লাভ করল। এতে মক্কার মুশরিকরা খুশি হয়ে মুসলমানদের বলতে লাগল, তোমরা কিতাবের অধিকারী হওয়ার দাবি কোরো। পারস্যবাসী মুশরিক, আমরাও মুশরিক। কিতাবধারীদের বিপক্ষে তাদের বিজয় আমাদের বিজয়ের পূর্বলক্ষণ। মক্কার মুশরিকদের এই ধারণার বিপরীতে আল্লাহ ভবিষ্যদ্বাণী করেন, আগামী ৯ বছরের মধ্যে রোমানরা পারস্যের বিরুদ্ধে জয়লাভ করবে। এটা ছিল এক বিরাট ভবিষ্যদ্বাণী। কেননা তা করা হয়েছিল দুটি বড় সাম্রাজ্যের ব্যাপারে এবং জয়-পরাজয়ের বর্তমান প্রবাহের বিপরীতে। একই সঙ্গে পারস্যের বিপরীতে রোমান সাম্রাজ্য নবীন ও ছোট ছিল। অন্যদিকে পারস্য সাম্রাজ্য ও রাজবংশ ছিল বহু শতাব্দীর প্রাচীন।

ফলে পারস্যের ধনভাণ্ডার ছিল সমৃদ্ধ, সেনাবাহিনীও ছিল খুব প্রশিক্ষিত ও সুদৃঢ়, পৃথিবীর বিখ্যাত অনেক বীর সেই বাহিনীর অংশ ছিল। অথচ কোনো প্রকার অস্পষ্টতা না রেখে স্পষ্ট ভাষায় ক্ষুদ্র ও দুর্বল সাম্রাজ্যের সপক্ষে ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। এই ভবিষ্যদ্বাণী মুসলমানদের একটি প্রকৃত ও যথার্থ আনন্দের সংবাদ ছিল। রোমানদের বিজয়ে মুসলমানরা আনন্দিত হবে। কেননা তাদের বিরুদ্ধে যে শুভলক্ষণ মুশরিকরা গ্রহণ করেছিল তা মিথ্যা প্রমাণিত হবে। মুশরিকদের আনন্দে ও আত্মপ্রসাদ মাটিতে মিশে যাবে।

আল্লাহ তাআলা এখানে একসঙ্গে দুটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন

ক. পারস্যের ওপর রোমানরা বিজয়ী হবে, খ. অবিশ্বাসীদের ওপর মুসলমানরা বিজয়ী হবে। ভবিষ্যদ্বাণী করার পর বলা হচ্ছে, এই সত্য হওয়ার পর অবিশ্বাসীরা অবিশ্বাসীই থেকে যাবে। কেননা মহান আল্লাহ জানেন, সত্য গ্রহণের মতো সুস্থ হৃদয় তাদের নেই।

যে ভবিষ্যদ্বাণী বাহ্যত অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল, আল্লাহ তা সত্য প্রমাণ করেন। পৃথিবীর মানুষ তা প্রত্যক্ষ করেছে এবং ইতিহাসের পাতায় তা অমর হয়ে আছে। এই ভবিষ্যদ্বাণী ও তার বাস্তবায়ন ছিল মহানবী (সা.)-এর একটি বড় মুজিজা। এই মুজিজা জ্ঞানীদের ঈমান আনার জন্য অপরিহার্য না হলেও সাধারণ মানুষের জন্য তা কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বাসের উপকরণ ও মাধ্যম বলে গণ্য হবে। মাওয়ায়িজে আশরাফিয়া থেকে মো. আবদুল মজিদ মোল্লার ভাষান্তর
নিউটার্ন/এআর

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *