কবি, গীতিকার, সংগীতশিল্পী ও সৃজনশীল যোগাযোগকর্মি রাশনাফ ওয়াদুদ দীর্ঘদিন ধরে কোলন ক্যানসারের মতো কঠিন রোগের সঙ্গে লড়াই করে ১২ অক্টোবর, সোমবার, ঢাকার পান্থপথে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার আকস্মিক মৃত্যুতে গভীর শোক নেমেছে বাংলাদেশের ‘ইনডি’ (স্বাধীন) ধারার সংগীত, সৃজনশীল যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে।

সেইন্ট মেরি’স-এ শিক্ষাজীবন শুরু করে রাশনাফ উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান দিল্লিতে। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর সেখানেই সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। কবিতার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে ধীরে ধীরে গীতিকবি ও সংগীতশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি।

ঢাকায় এসেই রাশনাফ যুক্ত হন ক্রিয়েটিভ কমিউনিকেশন ও সংগীতাঙ্গনে। রেডিও স্বাধীনের শুরু থেকেই অনুষ্ঠান নির্মাণ, কনটেন্ট তৈরি, লাইভ শো, ফিউশন আয়োজন এবং নতুন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিজ্ঞাপনের জিঙ্গলসহ নানা সৃজনশীল প্রকল্পেও ছিল তার অবদান।

সংগীতশিল্পী হিসেবে ব্লান্ডারওয়্যার ব্যান্ডের লিড ভোকালিস্ট এবং দ্য অ্যাটেম্পটেড ব্যান্ডের সঙ্গে তার কাজ শ্রোতাদের কাছে তাকে পরিচিত করে তোলে। ‘আফিম চাষ’, ‘এই বিকেলে’ ও ‘ও মৌসুমী’র মতো গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নাম। ২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্র ইতি, তোমারই ঢাকা-তেও অভিনয় করেছিলেন তিনি।

তবে রাশনাফকে কেবল তার পেশাগত পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তার ভেতরে বাস করতেন একজন কবি—শব্দ, অনুভূতি, কল্পনা ও সৌন্দর্যের এক নিবেদিত অনুরাগী। সৃজনশীলতার সেই জগতে সংগীতও ছিল তার ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। সংগীতের প্রতি তার ভালোবাসা, সুরের সঙ্গে অনুভূতির সংযোগ এবং শিল্পের প্রতি তার অনুরাগ তার সৃজনশীল সত্তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল। কবিতা, সংগীত ও ভাবনার জগৎ যেন তার কাছে ছিল নিজেকে প্রকাশ করার ভিন্ন ভিন্ন ভাষা—যেখানে মনের কথা, জীবনের অনুভব এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা নতুন রূপ পেত।

তার মেধা, আন্তরিকতা, শিল্পীসত্তা এবং সহকর্মিদের প্রতি ভালোবাসা আমাদের কর্মক্ষেত্র ও ব্যক্তিগত জীবনে এক স্থায়ী স্মৃতি হয়ে থাকবে। কিছু মানুষ তাদের কাজের মাধ্যমে পরিচিত হন, আর কিছু মানুষ তাদের কাজের পাশাপাশি রেখে যান এক গভীর মানবিক ছাপ। রাশনাফ ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন।

১৪ অক্টোবর, বুধবার, ভোরে ফজরের নামাজের পরপরই গুলশান আজাদ মসজিদে তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

জানাজা শেষে মরদেহ বনানী ৪ নম্বর রোডের বাসভবনে রাখা হবে। সেখান থেকে রাশনাফ ওয়াদুদের মরদেহ চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় পূর্বপুরুষের ভিটায় নিয়ে যাওয়া হবে এবং পারিবারিকভাবে তাকে সমাহিত করা হবে।

রাশনাফের এ চলে যাওয়ায় যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা পূরণ হওয়ার নয়। তার গান, তার লেখা এবং একসঙ্গে কাজ করার স্মৃতির মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন তার আপনজনদের কাছে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *