মঞ্চে অভিনয় থেকে রোল, ক্যামেরা-অ্যাকশনের দুনিয়ায় অবাধ বিচরণ তার। দিল্লিতে বড় হওয়া চন্দন রায় সান্যাল প্রায় তিন দশক ধরে মুম্বই নিবাসী। কেমন এই দীর্ঘ যাত্রাপথ? সেই গল্পই শোনালেন অভিনেতা।

বিনোদন ডেস্ক :

পরিবারের সায় ছিল না। কিন্তু বাঁধাধরা চাকরিজীবন যে তার জন্য নয়, নিজের মনের সেই অনিবার্য দেওয়াললিখন তখন তার কাছে স্পষ্ট। তাই দিল্লির নিরাপদ পারিবারিক কোটর ছেড়ে মুম্বইয়ের ট্রেন ধরতে দেরি করেননি এক মুহূর্তও। প্রায় ২৮ বছর আগে যখন মায়ানগরীতে নামলেন, চোখেমুখে তার একরাশ স্বপ্ন। মুম্বই মানে তার কাছে অভিনয়ের তীর্থক্ষেত্র। সেই তীর্থনগরীই জানে তার লড়াই ও সাফল্যের প্রতিটা দিনের কথা, প্রায় তিন দশক ধরে।আনন্দবাজার ডট কম

আর এক নগরীতে তখন ভরা বর্ষার দুপুর, অঝোরে বৃষ্টি বাইরে। হোটেলের ঘরে বসে কথার ফাঁকে নিজের ফেলে আসা এই সব স্মৃতি একটু একটু করে খুঁড়ে আনছেন তিনি, চন্দন রায় সান্যাল। নিজেরই অভিনীত একটি ছবির জন্য কলকাতায় এসেছেন। দিল্লির বাঙালি পরিবারের ছেলে। তাই কলকাতার বাঙালির খাদ্যবিলাসও তার শিকড়েই। হোটেলের খাবারের মেনু কার্ডে চোখ বুলিয়ে রাতের খাবারের অর্ডারে বাছলেন বিউলির ডাল, পোস্তর বড়া আর সাদা ভাত! বললেন, ‘‘আর কন্টিনেন্টাল নয়, এ বার একটু বাঙালি খাবার হলে ভাল হয়।’’

অভিনয়ের স্বপ্ন বুকে থাকলেও সেই সুযোগ চন্দনকে মোটেই সহজে দেয়নি মায়ানগরী। অঙ্ক নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু চাকরি তো করবেন না। তাই মুম্বইয়ে স্রেফ টিকে থাকার জন্য টিউশন করতে শুরু করেন। সেইসঙ্গে চলতে থাকে অভিনয়ের জন্য চেষ্টা। চন্দনের কথায়, “আমার কাছে বিকল্প কোনও পথ ছিল না। বুঝেছিলাম অভিনয়টাই আমার একমাত্র ভালবাসা।”

অবশ্য অভিনয়ের ভূত দিল্লিতে থাকতেই পেয়ে বসেছিল কিশোর চন্দনকে। তার কথায়, শুধু অঙ্ক জানলেই তো অভিনেতা হওয়া যায় না। তার জন্য প্রয়োজন অন্য রকম শিক্ষার। চন্দনের জীবনে সেই শিক্ষা এসেছিল নাট্যব্যক্তিত্ব হবীব তনবীরের কর্মশালা থেকে। দিল্লিতে হবীব তনবীরের নাট্য কর্মশালায় যোগ দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে গিয়ে প্রথমেই অভিনয়ের পাঠ শুরু হয়নি। বরং শুরু হয়েছিল অপেক্ষা। টানা ৪০ দিন। চন্দন বললেন, “দিল্লিতে ওই কর্মশালায় যখন যোগ দিতে গিয়েছিলাম, তখন ৪০ দিন টানা শুধু বসেছিলাম। তিনি (হবীব) আসতেন, বসে পাইপ খেতেন, চলে যেতেন।” চন্দনের বক্তব্য, ওই ৪০টা দিনেই তিনি শিখেছিলেন, ধৈর্য কাকে বলে। ওটা ছাড়া যে কিছুই হয় না, সেটাই মুম্বইয়ের লড়াইয়ের দিনগুলোয় কাজে লেগেছে তার।

টানা কয়েক বছর লড়াইয়ের পরে সুযোগ আসে ২০০৬ সালে। তার আগে অবশ্য হিন্দি ও ইংরেজি থিয়েটারে অভিনয় করতে শুরু করেছেন কয়েক বছর ধরে। সিনেমায় প্রথম সুযোগ এল রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরার হাত ধরে ‘রং দে বসন্তী’-তে, আমির খান, সোহা আলি খান, মাধবনের সঙ্গে। ছোট্ট চরিত্র। ছবিতে একটি নাট্যদৃশ্যের মধ্যে বাঙালি স্বাধীনতাসংগ্রামী বটুকেশ্বর দত্তের চরিত্র। তার তিন বছর পরে বিশাল ভরদ্বাজের ‘কামিনে’ ছবিতে। এর পর একের পর হিন্দি ছবিতে সুযোগ। ২০১৭-তে ইমতিয়াজ় আলির ‘যব হ্যারি মেট সেজ়ল’-এ অভিনয়। বাংলা ছবিতে অভিষেক সুমন মুখোপাধ্যায়ের ‘মহানগর@কলকাতা’ দিয়ে। তার পরে ২০১৭-তে অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরীর ‘অপরাজিতা তুমি’। ২০১৯-এ বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘উড়োজাহাজ’ ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। গত বছর ফের অনিরুদ্ধের ছবি— ‘ডিয়ার মা’-তে। অঞ্জন দত্তের ‘গণেশ টকিজ়’-এ করেছেন বছর কয়েক আগে। বাংলা-হিন্দি মিলিয়ে ছবি প্রায় খান ত্রিশেক। যে কোনও বাঙালি অভিনেতার কাছে ঈর্ষণীয় এই তালিকা।

খাবারের মেনুর মতো অভিনয়ের ক্ষেত্রেও চন্দন নিজস্ব পছন্দকেই গুরুত্ব দিতে ভালবাসেন। সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপার মানুষ নন তিনি। বরং দীর্ঘ অপেক্ষা, চরিত্রের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নিজের শিল্পীসত্তাকে অক্ষুণ্ণ রাখার কথাই বার বার ফিরে আসে তার কথায়। কিন্তু বাঙালি হয়েও বাংলা ছবি তুলনায় কম তার ঝুলিতে। কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর যেন ‘উড়োজাহাজ’-এর বাচ্চু মণ্ডলের কাছেও নেই! তবে জানালেন, কলকাতায় এসেছিলেন গত বছর পুজোর সময়। তিন-চার দিনের জন্য। একটি মক শুটও করে গিয়েছিলেন। আর শুধু অভিনয় নয়, এখন নিজের ছবি তৈরির পরিকল্পনাও করছেন তিনি। বললেন, “আমি একটা নতুন ছবি তৈরি করার পরিকল্পনা করেছি। চিত্রনাট্য লিখছি, পরিচালনাও আমিই করব।”

বাংলা ছবি খুব বেশি না করলেও কলকাতায় গত কয়েক বছরে বেশ কিছু বন্ধু তৈরি হয়েছে তার। হাসতে হাসতেই জানিয়ে দিলেন চন্দন। আর বন্ধুভাগ্য নাকি তার বরাবরই ভাল! দিল্লি থেকে মুম্বই যাওয়ার সময়েও ছোটবেলার বন্ধুদের সাহায্য পেয়েছিলেন। তবে কাজের ক্ষেত্রে হয়তো ভাগ্যের থেকেও বড় ছিল তার নিজের সিদ্ধান্ত। এখন তিনি মধ্যচল্লিশ। সেই ১৮-১৯ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে মুম্বই ছুটেছিলেন স্বপ্ন পূরণ করার তাগিদে। সেটাও ছিল তার একার সিদ্ধান্ত। ‘আশ্রম’ সিরিজ়ের ‘ভোপা ভাই’ বললেন, “প্রবাসী হোক কিংবা কলকাতার, বাঙালি মধ্যবিত্ত বাড়ির মা-বাবা কখনও ভাবতেই পারেন না, ছেলে বা মেয়ে অভিনেতা হবে। বিশেষ করে, ওই বয়সে। আমার ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল। আমি তো না জানিয়েই মুম্বইয়ের টিকিট কেটে চলে গিয়েছিলাম।” চন্দনের কথায়, ‘‘মা একেবারেই মেনে নিতে পারেননি সেদিন।’’ সেই সময়ে কিছু বন্ধু তাকে একটা চাকরি পাইয়ে দেয়ার কথাও বলেছিলেন। যুক্তিটা খুব স্বাভাবিক। চাকরি থাকলে নিয়মিত আয় থাকবে, জীবনটা নিরাপদ হবে। অভিনয় করে ভবিষ্যতে কী হবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু চন্দনের নিজের কাছে প্রশ্নটা ছিল আরও সরল। অভিনয় ছাড়া তিনি আর কী-ই বা করবেন? “আমার কাছে বিকল্প কোনও পথ ছিল না। বুঝেছিলাম এটাই আমার একমাত্র ভালবাসা।”

চন্দনের পাঠ্যবিষয় অঙ্ক, আর পেশা বা প্যাশন অভিনয়। দুটোকে কি একসঙ্গে মেলানো গিয়েছে? চন্দনের কথায়, তার কাছে অভিনয়ও অনেকটা অঙ্কের মতোই। চরিত্রের হিসাব আছে, সংলাপের হিসাব আছে, কখন কতটা বলতে হবে তার হিসাব আছে। কোথায় থামতে হবে, কোথায় চুপ করে থাকতে হবে, কখন আবেগটাকে একটু পিছিয়ে রাখতে হবে— অভিনয়ের এই সূক্ষ্ম হিসাবনিকাশ হয়তো তাকে অনেক ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে।

বিকেলে এসপ্ল্যানেডের হোটেলের জানলার বাইরে তখনও বৃষ্টি। অবিরাম বৃষ্টিতে যেন থমকে আছে শহর। থামলেই কাজ শুরু হবে। বৃষ্টি কি অপেক্ষা শেখায়, ধৈর্য ধরতে শেখায়? হাবিব তনবীরের কর্মশালায় ৪০ দিন ঠায় বসে থাকার মতো? প্রসঙ্গ উঠতেই চন্দনের বক্তব্য, এখনকার প্রজন্মের ইঁদুরদৌড়, সমাজমাধ্যমের প্রতিযোগিতা, দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠার তাড়াহুড়ো— সব মিলিয়ে ধৈর্য যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। তার কথায়, “এই প্রজন্মের বড় একটা অংশ তো সমাজমাধ্যমের ফলোয়ারের দৌড়ে আটকে। কিন্তু এটাই বুঝতে পারে না, শিল্পীরা পণ্য নয়। আমি নিজের শিল্পীসত্তাকে পণ্য করতেও পারব না।” ২০ বছর আগে যখন অভিনয়জীবনে প্রবেশ করেন চন্দন, তখন ‘অ্যালগরিদ্‌ম’, ‘রিচ’, ‘রিল’, ‘ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার্স’— এই সব শব্দ ছিলই না জগতে। ফলে এক জন অভিনেতার পক্ষে নিজের জায়গা তৈরি করতে সময় লাগত। শিল্পীসত্তা এবং দক্ষতার উপর বেশি জোর দিতে হত শিল্পীদের। তাই প্রতিষ্ঠা পাওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু সেই কঠিন সময়েরও একটা আলাদা সৌন্দর্য ছিল বলে মনে করেন চন্দন।

দিল্লিতে তো বটেই, মুম্বইয়ে গিয়ে থিয়েটারে অভিনয়টাই ছিল তার মূল জায়গা। হিন্দি থিয়েটারে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি চন্দন। বেশ কিছু ইংরেজি নাটকও করেছেন। থিয়েটারে অভিনয়ের প্রসঙ্গে চন্দন বললেন, “স্কুল-কলেজে থিয়েটার করা এক রকম। আর চাকরি না করে অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেয়া অন্য রকম। প্রায় চার-পাঁচ বছর পরে যখন আমি একটা ব্রিটিশ থিয়েটার করে ভাল অর্থ উপার্জন করি, তখন মা কিছুটা বুঝেছিলেন যে ছেলে কিছু করছে।”

একটি ব্রিটিশ প্রযোজনায় কাজ করেই প্রথম বড় অঙ্কের পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন। বললেন, “পাউন্ডে পারিশ্রমিক পেয়েছিলাম। ভারতীয় মুদ্রায় মূল্য প্রায় ৫১ হাজার টাকা। ২০০৮-২০০৯-এর সময়ে তখন সেটা অনেকটাই ছিল।” ধীরে ধীরে থিয়েটার তাকে পরিচয় দিয়েছে, কাজ দিয়েছে, আত্মবিশ্বাস দিয়েছে, মনে করেন তিনি।

এখনও নাটক-থিয়েটারের প্রতি ঝোঁকটা আছে, জানালেন চন্দন। এখনও বিদেশে গেলে সেখানকার থিয়েটার দেখতে ভালবাসেন। কলকাতায় এলেও নাটক দেখার সুযোগ খোঁজেন। অভিনয় তার কাছে শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো নয়। তার মতে, অভিনয়সত্তার একটা বড় অংশ তৈরি হয় মঞ্চে, দর্শকের সামনে, দীর্ঘ অনুশীলনে।

এ বার অবশ্য চন্দনের কলকাতায় আসার কারণ অন্য। মুক্তি পেয়েছে ‘ডিপ ৬’। সুজিত সরকার প্রযোজিত এই স্বাধীন ছবিটির প্রচারেই মূলত কলকাতায় এসেছেন তিনি। এই ছবির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তার কাছে বিশেষ এক অভিজ্ঞতা— সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে একই ফ্রেমে অভিনয়। সেই সুযোগের কথা উঠতেই চন্দনের চোখেমুখে অন্য রকম উচ্ছ্বাস। বললেন, “যে-ই শুনেছিলাম সৌমিত্রবাবুর সঙ্গে সুযোগ পাব অভিনয় করার, তখন আর দ্বিতীয় বার ভাবিনি।”

চন্দনের মতে, এক জন অভিনেতার জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত থাকে, যেখানে হিসাব কাজ করে না। পারিশ্রমিক কত, চরিত্র কতটা বড়, ছবিতে নিজের উপস্থিতি কতটা— এই সব প্রশ্ন তখন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ চন্দনের কাছে তেমনই অমূল্য এক প্রাপ্তি।

এত নামীদামি পরিচালক ও অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেও জনপ্রিয়তার দৌড়ে নাম লেখাননি চন্দন। বরং এখনও বলেন, “অল্প কাজ, বাছাই করা চরিত্রেই আমি খুশি।” এমন চন্দনকেই দর্শক মনে রাখুক, এটাই চান তিনি। কারণ, অভিনয় তার ভালবাসা। তাই হয়তো তিনি আজও বিশ্বাস করেন, ভালবাসার সঙ্গে কখনও দৌড়োতে নেই। তাকে সময় দিতে হয়, অপেক্ষা করতে হয়। সাফল্য আসে, তার সময় মতোই।

চন্দনের সঙ্গে আলাপনের শেষে তখন বৃষ্টি থেমেছে বাইরে। এক বিকেল অপেক্ষার পরে।

আর সেই সময়ের অঙ্কটাই বোধহয় চন্দন রায় সান্যাল সবচেয়ে ভাল বোঝেন।

-উৎসা হাজরা

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *