গুপ্ত যুগ ও মধ্যযুগে উদ্ভব হয় ‘কাঞ্চুকী’ বা ‘কাঁচুলি’র। সে-ও এক রকমের বক্ষবন্ধনীই। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য— যেমন ‘চণ্ডীমঙ্গল’ বা অন্য মঙ্গলকাব্যে মহিলাদের কাঁচুলি পরার বিবরণ পাওয়া যায়। বিনোদন ডেস্ক : এ কি বেশ দেখি তব সীতে!! সদ্য মুক্তি পাওয়া ফ্যান্টাসি ড্রামা ‘রামায়ণ’-এর ট্রেলর প্রকাশ্যে আসতেই বিস্ময়ে বিহ্বল ভক্তকূল। যে পৌরাণিক চরিত্রদের গল্প শুনে, ছবির বই দেখে ছোটবেলা কেটেছে, সেই সীতা, কৈকেয়ী, শূর্পণখার গায়ে আধুনিক ছাঁটের সেলাই করা, সিক্যুইনের নকশাদার ব্লাউজ়। সঙ্গে পাট পাট কুঁচি আচল করে পরা শাড়ি। দেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এ সিনেমা কি সত্যিই ত্রেতা যুগের পৌরাণিক কাহিনি, না কি এ কালের শ্বাশুড়ি-বউমা মার্কা মেগা সিরিয়াল!আনন্দবাজার ডট কম বিতর্কের কারণ ওই ব্লাউজ়। যদিও ব্লাউজ় শব্দটি ইংরেজি। এখানে তার বদলে মহিলাদের ঊর্ধ্বাঙ্গ -বস্ত্র বলা যেতে পারে। রামায়ণের ট্রেলারে সীতা, কৈকেয়ীর, শূর্পণখা পরিহিত ‘ব্লাউজ়’ দেখে প্রশ্ন উঠেছে রামায়ণের যুগে কি মহিলারা ওই ধরনের পোশাকেই ঊর্ধ্বাঙ্গ ঢাকতেন? ফ্যান্টাসি ড্রামা রামায়ণ-এ কৈকেয়ীর পরণে শিফনের উপর পুঁতি-জড়ির নকশাদার শাড়ি এবং ব্লাউজ়। যা বলিউড ভক্তদের একালের শ্বাশুড়ি-বউমা জাতীয় ধারাবাহিকের দৃশ্য মনে করিয়ে দিয়েছে। কেমন ছিল নারীর উর্ধ্বাঙ্গের পোশাক?পোশাকের ইতিহাসে চোখ রাখলে দেখা যাবে, আজ যে ব্লাউজ়কে শাড়ির আবশ্যিক সঙ্গী বলে মনে হয়, তার পথচলা খুব বেশি দিনের নয়। কাপড় কেটে এবং তাকে সেলাই করে জুড়ে বানানো ব্লাউজ় ভারতীয় মহিলারা পরতে শিখেছেন ব্রিটিশরা এ দেশে আসার পরে। সুতোর ফোঁড় দিয়ে তৈরি করা জামার ইতিহাসও আড়াই হাজার বছরের বেশি পুরনো নয়। ভারতে তখন মৌর্য্য রাজাদের শাসন চলছে। সেই সময়ে দেশে সেলাই করা পোশাক পরা শুরু হয় বলে জানাচ্ছে ইতিহাস। তবে মহিলারা সেই কালেও উর্ধ্বাঙ্গে সেলাই করা বস্ত্র পরতেন না। ব্লাউজ় তো দূর অস্ত। সে কালের সমাজে সেলাই করা পোশাককে মনে করা হত ‘অপবিত্র’। বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তাই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পোশাক বলতে ছিল মূলত দুই টুকরো সেলাইহীন কাপড়— এক, ‘অন্তরীয়’ (নিম্নাঙ্গের বস্ত্র) এবং দুই, ‘উত্তরীয়’ (উর্ধ্বাঙ্গের বস্ত্র, যা মূলত চাদর বা ওড়না)। নারীদের ক্ষেত্রে বুক ঢেকে রাখার জন্য ব্যবহার করা হতো ‘স্তনপট্ট’ যা মূলত একটি কাপড়ের পটি যা বুকের চারপাশে শক্ত করে বেঁধে রাখা হতো। তার ওপর দিয়ে জড়িয়ে নেয়া হতো উত্তরীয়। পরে গুপ্ত যুগ ও মধ্যযুগে উদ্ভব হয় ‘কাঞ্চুকী’ বা ‘কাঁচুলি’র। সেও এক রকমের বক্ষবন্ধনীই। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য— যেমন চণ্ডীমঙ্গল বা অন্য মঙ্গলকাব্যে মহিলাদের কাঁচুলি পরার বিবরণ পাওয়া যায়। অবশ্য নিম্নবর্গীয় নারীদের কাঁচুলিও পড়ার জো ছিল না। দু’খণ্ড বস্ত্র পরার অনুমতি ছিল না তাদের। নিম্নবর্গীয় মহিলারা তাই উর্ধ্বাঙ্গ ঢাকতেন কাঠের, পুঁতির কিংবা পাতার মালায়। এখনও এ দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় মহিলারা একটি বস্ত্র খণ্ড বা শাড়ি দিয়েই লজ্জা নিবারণ করেন। ব্লাউজ় পরার চল আজও নেই বহু আদিবাসী এলাকায়। তবে শুধু তাদের কথাই বা বলা কেন! পঞ্চাশ কিংবা ষাটের দশকে সাধারণ গ্রাম কিংবা বর্ধিষ্ণু এলাকায় বহু সাধারণ পরিবারেও মহিলারা বাড়িতে ব্লাউজ় পরতেন না। বদলে গায়ে জড়িয়ে রাখতেন আঁচল। সেলাই করা ব্লাউজ়ের সূচনা কবে থেকে?এ দেশে শাড়ির নিচে সেলাই করা পোশাক পরা শুরু হয়েছিল আঠারো শতকের গোড়ায়। সেমিজের উপরে শাড়ি পরতে শুরু করেছিলেন শহরাঞ্চলের অভিজাত পরিবারের মহিলারা। যা আদতে শরীরের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত পাতলা সুতির বা মসলিনের লম্বা ঝুলের জামার আকৃতির একটি পোশাক। নাম সেমিজ। ভিক্টোরিয়ান যুগের ইউরোপের মহিলারা পোশাকের নিচে অন্তর্বাস হিসেবে পরতেন ওই সেমিজ। এ দেশের মহিলারা তার উপরেই শাড়ি পরতে শুরু করেন। এ কালে যে ব্লাউজ় পেটিকোটের সঙ্গে শাড়ি পরার ধরন, তা প্রথম চালু করেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেজ বৌঠান এবং প্রথম ভারতীয় আইসিএস সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। ১৮৭০-এর দশকে স্বামী সত্যেন্দ্রনাথের কাজের সূত্রে তৎকালীন বোম্বাইয়ে থাকতে যান জ্ঞানদানন্দিনী। সেখানে পার্সি নারীদের শার্টের সঙ্গে শাড়ি পরার আদবকায়দা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নিজের মতো করে তৈরি করেন শাড়ি পরার এক পদ্ধতি। যাকে বলা হত ‘ব্রাহ্মিকা শাড়ি’। ওই ভাবে পরা শাড়ির নাচে থাকতো পেটিকোট এবং উপরে জ্যাকেট বা ভিক্টোরিয়ান ব্লাউজ়ের মতো সেলাই করা পোশাক। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে সেই ব্লাউজ়ের হাতা হত কব্জি পর্যন্ত। হাই-নেক গলা, তাতে লেসের কাজ। তিরিশ-চল্লিশের দশকে ব্লাউজ়ের হাতা খাটো হয়। ফ্যাশনে আসে পাফ স্লিভ। পরে ষাট ও সত্তরের দশকে বলিউড সিনেমার প্রভাবে বোট নেক, ব্যাকলেস এবং টাইট-ফিটিং ব্লাউজ় জায়গা করে নেয় ফ্যাশনে। আর এ যুগে ক্রপ টপ থেকে ব্রালেট হয়ে কাঁধখোলা কাঁচুলি, সবই হয়ে উঠছে শাড়ির সঙ্গী। রামায়ণের নারীরা ‘ব্লাউজ়’ পরতে পারেন? বিতর্কের শুরু যা থেকে। রামায়ণের নারীরা কি আধুনিক কালের আদলে শাড়ি বিশেষ করে সেলাই করা ব্লাউজ় পরতে পারেন? মনে রাখতে হবে রাম-সীতা-লক্ষ্মণের উদ্ভব এবং অযোধ্যারাজ ত্রেতা যুগে। কলি যুগ থেকে হিসাব করলে, আগে পড়বে দ্বাপর। যে যুগে মহাভারতের ঘটনাবলি। তারও আগে রামায়ণের ত্রেতা। রামায়ণের ঐতিহাসিক কালনির্ণয় অতি জটিল ব্যাপার। মহাকাব্য এক দিনে লেখা হয় না, আর তাতে সংযোজন-বিয়োজনের খেলা চলে যুগে যুগে। মূল বাল্মীকি রামায়ণ আর মহাকবি তুলসীদাস বা কৃত্তিবাস ওঝা প্রণীত রাম-কথায় ফারাক বিস্তর। যদি ধরে নেয়া যায়, আজকের রামায়ণ ছায়াছবি সব রকমের রাময়ায়ণকে ছুঁয়ে রয়েছে, তবে পোশাক বিতর্কের অর্থ থাকে না। কী পরতেন ত্রেতা যুগের ভারতীয়রা, তা সম্যক জানা না গেলেও, তার অনেক পরে কলির বৌদ্ধযুগেও নারীদের অঙ্গে কাটা এবং সেলাই করে জোড়া পোশাক যে ওঠেনি, তার সাক্ষ্য দেয় মৌর্য থেকে গুপ্তযুগ পর্যন্ত প্রসারিত ভারতীয় সাহিত্য, চিত্রকলা ও স্থাপত্য। সেই হিসাব ধরে এগোলে ২০২৬ সালের ফ্যান্টাসি ড্রামা ‘রামায়ণ’-এ ঠিক কী পরানো উচিত ছিল সীতা-কৈকেয়ীদের, সে আলোচনা বরং তোলাই থাক। বিতর্ক মুলতুবি রেখে বলাই যায়, পুরাণ বর্ণিত ত্রেতা যুগে যদি রাম-সীতা-লক্ষণের মতো সুবেশী নারী পুরুষ থেকেই থাকেন, তারা পুষ্পক রথে চাপতে পারেন, তবে সেলাই করা ব্লাউজ়ও না হয় হয় সীতা পরলেন। আসল কাহিনির তাতে বিন্দুমাত্র রসহানি ঘটে কি? Post Views: 27 Post navigation বয়সকে ধোঁকা ৫১-র মহেশ বাবুর! দু’টি খাবারে নিষেধাজ্ঞা, কী ভাবে আজও যৌবন ধরে রেখেছেন তিনি মূল ধারার বিনোদনমূলক ছবিই সব জায়গায় ইন্ডাস্ট্রিকে টেনে নিয়ে যায়! আড্ডায় বসে অকপট বার্তা জিতের