কোলোম্বিয়ায় এই ভূমিকম্পের কারণ বেশ কয়েকটি টেকটনিক পাতের ক্রিয়া। যার মধ্যে রয়েছে নাজকা, দক্ষিণ আমেরিকান এবং ক্যারিবিয়ান পাত।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
কোলোম্বিয়ার ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা প্রায় দুই শতাধিক। ৭.৪ মাত্রার কম্পনে দেশের পশ্চিম প্রান্তের বিস্তীর্ণ অঞ্চল‌ে সব কিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। তবে লাতিন আমেরিকায় মাঝেমধ্যেই ভূমিকম্প হয়। তার কারণ ওই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান আর কিছু পাতের গতিবিধি।

কোলোম্বিয়ার জিওলজিক্যাল সার্ভিস (এসজিসি) বলছে, সে দেশে দিনে ৮০টির মতো ভূমিকম্প ধরা পড়ে যন্ত্রে। মাসে প্রায় আড়াই হাজার। বেশির ভাগই অনুভূত হয় না। দক্ষিণ আমেরিকার আর এক দেশ ভেনেজ়ুয়েলাও ভূমিকম্পপ্রবণ। ওই দেশ রয়েছে ক্যারিবিয়ান এবং দক্ষিণ আমেরিকান টেকটনিক পাতের সংযোগস্থলে। বলতে গেলে গোটা দক্ষিণ আমেরিকাই ভূমিকম্পপ্রবণ। তার মধ্যে গুয়াতেমালা এবং নিকারাগুয়ায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

গোটা দক্ষিণ আমেরিকায় প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের বাস। গোটা মহাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভাল নয়। বহু দেশের বেশির ভাগ বাড়ি পাকা নয়। কোনও মতে অস্থায়ী নির্মাণে বসবাস করেন বাসিন্দারা। তার জেরে সামান্য ভূমিকম্প হলেই ধূলিস্যাৎ হয় বহু এলাকা। দক্ষিণ আমেরিকায় ঘন ঘন ভূমিকম্প হলেও তার প্রভাব সব অঞ্চলে কিন্তু এক নয়। তার জন্য দায়ী অর্থনৈতিক অবস্থা। এমনটাই মনে করেন ‘গ্লোবাল আর্থকোয়েক মডেল ফাউন্ডেশন’-এর ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ভিটর সিলভা। ভেনেজুয়েলায় মাস কয়েক আগে ভূমিকম্পে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ১,৪০০ জন। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কোলোম্বিয়ায় সোমবারের ভূমিকম্পে নিখোঁজ ২০০০ জনের বেশি। সে দেশের ভূবিজ্ঞান দফতর জানিয়েছে, কম্পনের পর ২১ বার ‘আফটারশক’ হয়েছে। পেরেইরা এবং ক্যালি ছাড়াও বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে চোকে এবং কফি অ্যাক্সিস অঞ্চলে। ক্যালি শহরে একটি বড় হাসপাতাল ভেঙে পড়েছে। ফলে বহু রোগী সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গিয়েছেন বলে প্রশাসন সূত্রে খবর।

কোলোম্বিয়ায় এই ভূমিকম্পের কারণ বেশ কয়েকটি টেকটনিক পাতের ক্রিয়া। যার মধ্যে রয়েছে নাজকা, দক্ষিণ আমেরিকান এবং ক্যারিবিয়ান পাত। দক্ষিণ আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল আবার প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় মেখলার অন্তর্ভুক্ত, যেখানে নিত্য দিন হয়ে চলে ভূমিকম্প। টেকটনিক পাতের সঞ্চালনই ভূমিকম্পের কারণ।

লাতিন আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরের প্রান্তের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে একই বিষয় লক্ষ্য করেছেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে মহাসাগরীয় পাতগুলি মহাদেশীয় বা পার্শ্ববর্তী পাতের নীচে চলে যাচ্ছে। চিলে এবং পেরু থেকে শুরু করে ইকুয়েডর ও কোলোম্বিয়া হয়ে সেন্ট্রাল আমেরিকা এবং মেক্সিকো পর্যন্ত এলাকায় এই পাতের গতিবিধির ফলে হতে থাকে ভূমিকম্প। দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তে আবার নাজ়কা পাতটি দক্ষিণ আমেরিকার পাতের নীচে তলিয়ে যাচ্ছে। ফলে ওই অঞ্চলে ভূমিকম্প হচ্ছে নিত্য। এ ভাবেই সেখানে তৈরি হয়েছিল আন্দিজ পর্বত।

দক্ষিণ আমেরিকার ভূমিকম্পপ্রবণ বলয়ের মধ্যেই ভেনেজ়ুয়েলার অবস্থান। এখানে ক্যারিবিয়ান পাত দক্ষিণ আমেরিকান পাতের সঙ্গে ক্রমশ পূর্ব দিকে সরছে। পাতগুলিতে এমন কিছু চ্যুতি রয়েছে, যেখানে কখনও দু’টি ভূ-ফলক একে অপরের গা ঘেঁষে অনুভূমিক ভাবে সরে সরে যায়। কখনও আবার ভূ-ফলকগুলি বাধা পেয়ে সম্মিলিত চাপ তৈরি করে। তার ফলে হঠাৎ ফাটল ধরে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরনের ভূমিকম্পকে ‘স্ট্রাইক স্লিপ’ ভূমিকম্পও বলা হয়। তাতে একটি পাতের নিচে জোর করে ঢুকে পড়ে অপর পাত।

ভূমিকম্পের আধিক্য প্রশান্ত মহাসাগরের চারপাশের অঞ্চলেও, যাকে বলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় মেখলা। ওই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হল জাপান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স, পশ্চিম আমেরিকা। বলা হয় গোটা পৃথিবীতে যত ভূমিকম্প হয়, তার ৯০ শতাংশ ওই অঞ্চলেই হয়। ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য নিত্যদিন তাই গবেষণা চালিয়ে যায় জাপান। তবে এখনও ঝড়বৃষ্টির মতো ভূমিকম্প আঁচ করতে পারেন না বিজ্ঞানীরা। তা রোধ করার ক্ষমতাও নেই। সে কারণে প্রাণ যায় বহু মানুষের।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *