আগামী মঙ্গলবার নন্দীগ্রামে বিধানসভা উপনির্বাচন। শুক্রবার ভোটগণনা। শুভেন্দু জানান, এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া মিটলেই ‘মিথ্যা প্রচারের’ অভিযোগে সরকার কী পদক্ষেপ করবে, তা ঘোষণা করা হবে।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

পাঁচ বছর আগে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে গিয়ে পা ভাঙা নিয়ে ‘মিথ্যা দাবি’ করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! শনিবার ফের এক বার এই অভিযোগ তুললেন মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে ঘোষণা করে দিলেন, ‘মিথ্যা প্রচারের’ জন্য তদন্তও শুরু করবে রাজ্য সরকার। উপনির্বাচন মিটলেই এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের কথা জানানো হবে। যদিও কালীঘাট তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষের দাবি, মমতার পায়ের জখম নিয়ে ‘কুৎসা এবং অপপ্রচার’ করা হচ্ছে। মমতার সে দিন চোট লাগা পায়ের একটি ছবিও সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছেন তিনি।

২০২১ সালের ১০ মার্চ নন্দীগ্রামে বিধানসভা ভোটের প্রচারে আহত হন মমতা। সে দিন হলদিয়ায় নিজের মনোনয়নপত্র জমা দেন তিনি। তার পরে আবার ফিরে যান নন্দীগ্রামে। কথা ছিল সেখানেই রাত্রিবাস করার। বিকেলে আমদাবাদের রানিচকে গিরির বাজারে দুর্গামন্দিরে পুজো দেন এবং রাধাগোবিন্দ মহোৎসবে যোগ দেন। সেখান থেকে মমতার কনভয় বিরুলিয়া হয়ে রেয়াপাড়ার দিকে যাচ্ছিল। পথে ঘোল পুকুরের কাছে গ্রামের রাস্তায় আহত হন তৃণমূলনেত্রী। মমতা সেই সময় অভিযোগ করেন, “আমি গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ করে চার-পাঁচ জন এসে আমাকে ঠেলে গাড়ির দরজাসমেত চেপে বন্ধ করে দেয়। পায়ে চোট লাগে। প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে।” তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সেই সময়ে জানিয়েছিলেন, নন্দীগ্রামের বিরুলিয়া বাজারে তিনি গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একটি মন্দিরে প্রণাম করছিলেন। সেই সময়ে চার-পাঁচ জন এসে তাকে গাড়ির দরজা দিয়ে চেপ্টে দেয়। ‘ষড়যন্ত্র করে ওই চার-পাঁচ জন’ হামলা করেছেন বলে মমতা দাবি করেছিলেন। চোট পাওয়ার পরে নিরাপত্তারক্ষীরাই তার প্রাথমিক শুশ্রূষা করেন। কাছের একটি মিষ্টির দোকান থেকে বরফ নিয়ে তার পায়ে লাগানো হয়। বেঁধে দেয়া হয় ব্যান্ডেজ। বরাবর গাড়িতে চালকের পাশের আসনে বসেন মমতা। তবে জখম হওয়ার পরে নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে পাঁজাকোলা করে গাড়ির পিছনের আসনে শুইয়ে দেন।

প্রথমে বিরুলিয়া থেকে গাড়িতে নন্দীগ্রামে তার তৎকালীন অস্থায়ী ঠিকানা রেয়াপাড়ার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি গাড়ি থেকে নামতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত নন্দীগ্রাম থেকে ‘গ্রিন করিডর’ করে তাকে নিয়ে আসা হয় কলকাতায় এসএসকেএমের উডবার্নের ১২.৫ নম্বর কেবিনে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর চিকিৎসার জন্য পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ডও গঠন করা হয়েছিল।

এসএসকেএমে একাধিক পরীক্ষা ও প্রাথমিক চিকিৎসার পর সিদ্ধান্ত হয়, তার এমআরআই করানো হবে। সেই মতো অ্যাম্বুল্যান্সে করে নিয়ে যাওয়া হয় বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেসে। এমআরআই করিয়ে ফের এসএসকেএম হাসপাতালে আনার পর মেডিক্যাল বুলেটিনে এসএসকেএম-এর তৎকালীন অধিকর্তা (যিনি বর্তমানেও দায়িত্বপ্রাপ্ত) চিকিৎসক মণিময় বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, বাঁ পায়ের গোড়ালির হাড়ে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন মমতা।

সে বার পায়ে প্লাস্টার নিয়ে ভোটের প্রচার করেছিলেন তিনি। তৃণমূল স্লোগান তুলেছিল, ‘ভাঙা পায়ে খেলা হবে’। পরে হুইল চেয়ারে বসে নন্দীগ্রামে প্রচারে গিয়ে কারও নাম না-করে মমতা বলেছিলেন, “ভোটের সময় তুই আমার পা জখম করিয়েছিস। আমি চেপে গেছি ভদ্রতা করে। আজও আমায় পা ভাঙা নিয়ে হুইলচেয়ারে বসে মিটিং করতে হচ্ছে। তোমার নির্দেশ ছাড়া এ সব হতে পারে না।’’

সে বারের ভোটে শুভেন্দুর কাছে নন্দীগ্রামে পরাস্ত হয়েছিলেন মমতা। বস্তুত, মমতার ওই মন্তব্য নিয়ে ২০২১ সালের প্রচার পর্ব থেকেই সরব হয়েছিল বিজেপি। পদ্ম শিবির সেই সময়ে একাধিক বার অভিযোগ করেছিল, চক্রান্ত করে পায়ে আঘাতের কথা বলে নন্দীগ্রামবাসীকে অপমান করছেন মমতা।

এ বার সেই ঘটনা নিয়ে পূর্বসূরির বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুললেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী। নবান্ন থেকে হাসপাতালের নথিপত্র দেখিয়ে দাবি করলেন, ওই দিন মমতার পায়ে কোনও ‘ফ্র্যাকচার’ হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলেন, “২০২১ সালে পুরো নন্দীগ্রামকে মুখ্যমন্ত্রী (তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা) অপমান করেছিলেন— তার পা নাকি ভেঙে দেয়া হয়েছে!” এর পরেই বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সের রেডিয়োডায়গনোসিস বিভাগের একটি নথি উঁচিয়ে দেখান তিনি। জানান, সেটি ২০২১ সালের ১১ মার্চের নথি। মমতার চিকিৎসা-সংক্রান্ত ওই নথি দেখিয়ে শুভেন্দুর বক্তব্য, ওই নথিতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে— ‘ফ্র্যাকচারের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি’।

পাঁচ বছর আগে নন্দীগ্রামের ওই ঘটনার পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর চিকিৎসায় মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। ওই বোর্ডের এক সদস্যের সঙ্গে শনিবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিকিৎসায় চার-পাঁচ সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠিত হয়েছিল। সেই চিকিৎসক দলে অর্থোপেডিক, সার্জারি, নিউরো মেডিসিন, নিউরো সার্জারির চিকিৎসকরা ছিলেন। এস‌এসকেএমের ডিরেক্টর মণিময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে পুরো বিষয়টি এগিয়েছিল। মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শ মেনে রোগীর স্বার্থে যা করণীয় তা করা হয়েছিল।”

ওই চিকিৎসক আরও বলেন, “যে রিপোর্টের কথা বলা হচ্ছে, সেটি বাঁ দিকের হাটুর সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট। যত দূর মনে পড়ছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর গোড়ালি, পায়ের পাতায় চোট ছিল। সিটি স্ক্যানের পাশাপাশি এম‌আর‌আই , এক্স-রে-সহ অনেকগুলো পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছিল। শুধু বাঁ‌ হাটুর সিটি স্ক্যানের রিপোর্টের উপরে ভিত্তি করে কিছু বলা সম্ভব নয়।” তার দাবি, এম‌আর‌আই, এক্স-রে রিপোর্ট কী ছিল তা-ও দেখতে হবে। আমাদের বলা হয়েছিল, ভোটের প্রচারে ওকে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে। তাই সব দিক বিচার করে মেডিক্যাল বোর্ড সম্মিলিত ভাবে যে চিকিৎসা পদ্ধতি স্থির করেছিল, তা-ই মেনে চলা হয়েছিল। একার সিদ্ধান্তে কিছু হয়নি।’’

এ দিনের ঘটনার কথা জানাজানি হ‌ওয়ার পরে মেডিক্যাল বোর্ডের আর এক সদস্য জানান, “এই বিতর্ক তো নতুন নয়। এর আগে সিপিএম নেতা সুশান্ত ঘোষের মেডিক্যাল বোর্ড নিয়েও এক‌ই রকম সমস্যা তৈরি হয়েছিল। সেই থেকে শিক্ষা নিয়ে এক জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে আমার মতামত জানিয়ে এসেছি। আমি যে বিভাগের বিশেষজ্ঞ সেই জনিত কোন‌ও সমস্যা ছিল না। যা সত্যি তাই লিখেছি। মেডিক্যাল বোর্ডের অন্য সদস্যেরাও রিপোর্টে এমন কিছুই করেননি যা চিকিৎসা বিজ্ঞানসম্মত নয়। আমি চাকরি করি। ডিরেক্টর যদি বলেন আমাকে মেডিক্যাল বোর্ডে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে থাকতে হবে, আমি কি না বলতে পারি?”

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে উডবার্নে আনার পর সেখানে এস‌এসকেএমের একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে ডেকে আনা হয়েছিল। তারা সকলেই যে মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্য ছিলেন এমন নয়। অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধান মুকুল ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। উডবার্নে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কেবিনের কাছাকাছি একটি ঘরে অন্য চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সেই দলে থাকা এক প্রবীণ চিকিৎসক বলেন, “অনেক চিকিৎসককে ডিরেক্টরের নির্দেশে উডবার্নে হাজির হতে হয়েছিল। একটা সময় পরে আমাদের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর কেবিন থেকে বেরিয়ে বোর্ড রুমে অপেক্ষা করতে বলা হয়। প্লাস্টার‌ও আমাদের এস‌এসকেএমের চিকিৎসক করেননি বলেই জেনেছিলাম। এটা নিয়ে তখন খুব হ‌ইচ‌ই হয়। সেখানে হাজির ছিলেন তৎকালীন ডিএম‌ই দেবাশিস ভট্টাচার্য। আমি তাকে গিয়ে বললাম‌ও, এক জন বাইরের অর্থোপেডিক কেন মুখ্যমন্ত্রীর প্লাস্টার করবেন? উনি বলেন, কী করবে বলো! আমিও তো চাকরি করি।”

আরজি কর কাণ্ডের সময় চিকিৎসক সংগঠনগুলি অভিযোগ করেছিলেন, এই ‘বহিরাগত’ চিকিৎসক আর কেউ নন, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ঘনিষ্ঠ’ হিসেবে পরিচিত চিকিৎসক শ্যামাপ্রসাদ দাস। এ দিন আনন্দবাজার ডট কম-কে চিকিৎসক দাস বলেন, “আমাকে ডাকা হয়েছিল বলে আমি এস‌এসকেএমে গিয়েছিলাম। প্লাস্টার আমি করিনি। এস‌এসকেএমের অর্থোপেডিক বিভাগই যা করার করছিল। এক জন বাইরের চিকিৎসক হয়ে আমি কখন‌ও সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করতে পারি? আমি এ সব কখন‌ও করি না। তবে পায়ের পাতায় আঘাতজনিত কারণে ফ্র্যাকচার ছিল। পায়ের পাতায় যে ছোট ছোট হাড় থাকে সেগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আঘাতের জায়গায় রক্ত‌ও জমাট বেঁধে ছিল।”

কালীঘাটপন্থি তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল দাবি করেছেন, মমতার পায়ের চোট নিয়ে রাজনীতি করেছেন শুভেন্দু। সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, “মমতাদির পা-এর চোট নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর রাজনীতি দুর্ভাগ্যজনক ও রুচিহীন। কারও ব্যক্তিগত জখম নিয়ে কুৎসা ও অপপ্রচার আপত্তিকর। মমতাদির পায়ে জখম ছিল এবং সংশ্লিষ্ট ডাক্তারেরা তার সাক্ষী।”

মমতার পায়ের ফোলা ভাব এখনও পুরোপুরি মেটেনি বলে দাবি করেন কুণাল। তার বক্তব্য, “নরম টিস্যু, পেশি আর হাড়ের উপর গভীর আঘাত সারা কঠিন। এখনও মমতাদির পায়ে ফোলা অংশ স্বাভাবিক নয়। আমি যতদূর জানি, পুরো সারেনি। তা নিয়ে উপনির্বাচনের আগে এই কুৎসিত রাজনীতি আপত্তিকর, নিন্দনীয়।”

আগামী মঙ্গলবার নন্দীগ্রামে বিধানসভা উপনির্বাচন রয়েছে। শুক্রবার ভোটগণনা। বর্তমানে সেখানে নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর রয়েছে। তাই এখনই এ বিষয়ে বিশদ মন্তব্য করতে চাননি মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আমি এটা নিয়ে বাড়তি কিছু বলছি না। সিআইডি তদন্ত করছে। নির্বাচনীবিধি উঠে গেলে এই মিথ্যা প্রচারের জন্য আমরা নতুন করে তদন্ত করব। সেটা আমি ৯ তারিখের পর জানাব।”

বস্তুত, শুক্রবারই নন্দীগ্রামে ভোটের প্রচারে গিয়ে মমতার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। নন্দীগ্রামের নির্বাচনী প্রচারের মঞ্চ থেকে যে অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি, এ বার নবান্ন থেকে তারই নথি দেখান শুভেন্দু। একই সঙ্গে তদন্তেরও হুঁশিয়ারি দিলেন। বললেন, “৯ তারিখের পর অ্যাকশন হবে। অভিযোগ করলে যেমন তদন্ত হয়, মিথ্যা অভিযোগ করলেও ব্যবস্থা নেয়া যায়।”

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *